ভারত কি আমাদের বন্ধু!
আমাদের বন্ধুরূপী ভারত প্রকৃতপক্ষে কখনোই আমাদের বন্ধু ছিল না, এখনো নেই। ইতিহাস সাক্ষী যে, ভারতের রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ সব সময়ই বিশাল ও বিস্তৃত এলাকা জুড়ে অখণ্ড ভারতের স্বপ্ন দেখেছে এবং বর্তমান বাংলাদেশকে তার অংশ হিসেবেই তারা বিবেচনা করেছে।
মুসলমানদের, তা যে ভাষাভাষীই হোক, পৃথক আবাসভূমি ও মুসলমানদের উন্নতি তারা কখনোই সহ্য করতে পারেনি। বাঙালি মুসলমানদের “বন্ধু সেজে” ভারত ১৯৭১ এ আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধে আমাদের সহায়তা করেছিল। প্রকৃতপক্ষে, তারা তাদের প্রধান শত্র“ “পাকিস্তান”কে ভেঙে দু’ টুকরা করার এজেন্ডা নিয়ে তা করেছিল, আমাদের বন্ধু হিসেবে নয়। সাথে উপরি পাওনার লক্ষ্য ছিল স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্রকে রাজনৈতিকভাবে নিয়ন্ত্রণ করা এবং এদেশকে তাদের অর্থনৈতিক বাজারে পরিণত করা। এর সবই তারা করতে পেরেছে। তবে, যেটা বলছিলাম – মুসলমানদের উন্নতি কোনদিনও তারা মেনে নেয়নি, নিতে চায়নি, নিতে পারেনি। তাই, মুসলিম অধ্যুষিত পূর্ববঙ্গের মুসলমানদের উন্নতির জন্য ১৯০৫ সালে “বঙ্গভঙ্গ” করা হলে তারা এর বিরুদ্ধে দুর্বার আন্দোলন শুরু করে এবং মাত্র ৬ বছরের মাথায়, ১৯১১ সালে, বঙ্গভঙ্গ রদ করে দুই বাংলা পুনরায় একত্রিত করতে বৃটিশ শাসকদের বাধ্য করে।
তাদের শত বাধা ও আপত্তির পরও শেষ পর্যন্ত ১৯৪৭’এ ভারতবর্ষ বিভক্ত হয় এবং মুসলিম অধ্যুষিত “পূর্ব” ও “পশ্চিম” পাকিস্তান নিয়ে একটি মুসলিম রাষ্ট্র “পাকিস্তান” জন্ম লাভ করে। এরপরও মুসলিমবিরোধী ভারতের নেতৃবৃন্দের ষড়যন্ত্র থেমে থাকেনি। যার ফলে ১৯৪৭ এর পর হতেই ভারতের নেতৃবৃন্দের কূটকৌশল শুরু হয় পাকিস্তান ভাঙার। ১৯৪৭ থেকে ১৯৭১ পর্যন্ত ভারতের নিরন্তর চিন্তা ও চেষ্টা ছিল তাদের চিরশত্র“ এই পাকিস্তানকে দ্বিখণ্ডিত করার। সেই উদ্দেশ্যেই ১৯৭১’এ আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধে ভারত সাহায্য করেছিল। ১৯৭১ এ আমরা করেছি “আমাদের স্বাধীনতার যুদ্ধ” এবং ভারত করেছে তাদের শত্র“ নিধন যুদ্ধ”। সে সময়ে আমাদের সহায়তা করার পেছনে ভারতের লক্ষ্য ছিল তিনটিঃ
(১) তাদের শক্তিশালী প্রতিপক্ষ পাকিস্তানকে ভেঙ্গে দু’ টুকরো করে তাদেরকে দুর্বল করা।
(২) স্বাধীন বাংলাদেশ এর উপর রাজনৈতিক প্রভুত্ব সৃষ্টি/ বজায় রাখা।
(৩) বাংলাদেশকে তাদের পণ্যের বাজার বানানো।
কৌশলগত দিক থেকে ভারত শতভাগ সফল হয়েছে বলতে হবে। তারা মোটামুটিভাবে তাদের সব উদ্দেশ্যই অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে। যারা বলে যে, ভারত আমাদের বন্ধু, তাই ১৯৭১’এ আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধে তারা আমাদের সহায়তা করেছে, তারা প্রকৃত ইতিহাস খতিয়ে দেখেন না অথবা জেনেও না জানার বা বুঝেও না বোঝার ভান্ করেন। কিংবা তারা জ্ঞানপাপী। প্রকৃতপক্ষে, ভারত তাদের স্বার্থসিদ্ধির জন্য যা করা প্রয়োজন মনে করেছে, তাই করেছে। ঘটনাক্রমে, তা আমাদের স্বার্থের সাথে পরিপূরক ও সম্পূরক হয়েছে। তাদের I আমাদের উদ্দেশ্য কখনোই এক ছিল না, এখনো নেই। তাই, সত্যিকার অর্থেই ভারত তাদের “যুদ্ধ” করেছে, এবং আমরা আমাদের “যুদ্ধ” করেছি।
ভারত যে আমাদের প্রকৃত বন্ধু নয় তা স্বাধীনতা উত্তর বাংলাদেশে সুস্পষ্টভাবে প্রতীয়মান। স্বাধীনতা উত্তর বাংলাদেশে বিগত ৪9 বৎসর আমরা ভারতের কি আচরণ দেখতে পাই? ভারত কি তাদের কথাবার্তা, আচার-আচরণ, কর্মকাণ্ড ইত্যাদি দিয়ে প্রমাণ করতে পেরেছে যে তারা বাংলাদেশকে বন্ধু মনে করে? কেবলমাত্র অন্ধ ভারতীয় দালাল ও তাদের তাঁবেদার (কেউ কেউ তাদের “ভাজাকার” বলেন, কেউ বলেন “ভাদা”) ছাড়া কেউ তা মনে করে না। বরং, অন্ধ “ভাজাকার” বা “ভাদা” ছাড়া সকলেই বিশ্বাস করেন যে, প্রতিটি ক্ষেত্রে তারা আমাদের উপর কর্তৃত্ব/ প্রভুত্ব বজায় রাখার লক্ষে যা যা করণীয় তার সব কিছুই তারা করেছে, করছে। কোন কিছুকেই তারা তোয়াক্কা করেনি, এখনো পরোয়া করে না।
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে ভারতীয়রা যে ভারত-পাকিস্তানের যুদ্ধ হিসেবে গণ্য করে থাকে সেটা তারা সম্প্রতি নতুন করে প্রমাণ করেছে “গুণ্ডে” নামের হিন্দি চলচ্চিত্র দিয়ে। গত ১৪ ফেব্র“য়ারি ২০১৪ তারিখে ভারতে মুক্তিপ্রাপ্ত ওই চলচ্চিত্রটির সূচনা বক্তব্যে ভারতীয় অভিনেতা ইরফান খান বলেন, “১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১, শেষ হলো ভারত-পাকিস্তানের তৃতীয় যুদ্ধ। সেদিন ভারতীয় সেনাবাহিনীর কাছে প্রায় ৯০ হাজার পাকিস্তানী আর্মি আত্মসমর্পণ করে। এই যুদ্ধের ফলে জন্ম নিলো নতুন একটি দেশ, বাংলাদেশ।” এ কথায়ই আবারও প্রমাণিত হয় যে, তারা (ভারত) আমাদের মুক্তিযুদ্ধকে কিভাবে মূল্যায়ন করে। ভারতের যেসব সামরিক অফিসার ১৯৭১ এর সেই যুদ্ধে অংশগ্রহন করেছে এবং পরবর্তীতে বই লিখেছে, তাদের লেখনীতেও একই মনোভাব! বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃতির ফলে এদেশের মানুষ চলচ্চিত্রটির বিরুদ্ধে প্রতিবাদের ঝড় তুললে নির্মাতা যশরাজ ফ্লিমস ব্লগে দুঃখ প্রকাশ করেছে। কিন্তু এর দায় তো ভারতীয় সেন্সর বোর্ড এরই, অর্থাৎ সরকারেরই। তারা দেখে, জেনে-শুনে এমন একটি ইতিহাস বিকৃত চলচ্চিত্র প্রদর্শনের অনুমোদন কিভাবে দিলো? দিলো এ কারণে যে, সরকারের মনোভাবও একই রকম। ভারত কখনোই ১৯৭১ সালে আমাদের সশস্ত্র বাহিনী ও সর্বস্তরের জনগণের মুক্তিযুদ্ধ স্বীকৃতি দেয়নি, যথার্থ মূল্যায়ন করেনি। বরং সব সময়ই অবমূল্যায়নই করেছে।
বাংলাদেশের মানুষ ৯০% মুসলমান এবং ধর্মপ্রাণ, ধর্মান্ধ নয়। শতাব্দীর পর শতাব্দী এখানে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিদ্যমান রয়েছে। তাই তো গান শুনতে পাওয়া যায়, “গ্রামের নওজোয়ান, হিন্দু-মুসলমান” মিলিয়া বাউলা গান আর মুর্শিদী গাইতাম/ “আগে কি সুন্দর দিন কাটাইতাম।” কিন্তু, এরপরও একথা নিঃসন্দেহে বলা যায় যে, এদেশের জনগণ কখনো ভারতকে বন্ধু মনে করেনি, এখনো করে না। ভারত এ যাবত বাংলাদেশের সাথে/ জন্য যা করেছে, তার প্রতিটি কর্মেই রয়েছে মুসলমান পীড়ন তথা বাংলাদেশী বাঙালি জাতির মেরুদন্ড ভেঙ্গে দেয়ার দুরভিসন্ধি।
এ দেশের জনগণ কেন ভারতকে বন্ধু মনে করে না তা নিয়ে অনেক গবেষণা হতে পারে, হাজার হাজার পৃষ্ঠার তথ্য-উপাত্ত দেয়া যেতে পারে। আমি এত বিস্তারিত বর্ণনায় না যেয়ে সংক্ষিপ্ত আকারে বড় বড় কয়েকটি উদাহরণ পেশ করতে চাই। নিচের বর্ণনা থেকেই ভারতের প্রকৃত চিত্র স্পষ্ট হয়ে যাবে :
(১) দু’ দেশের সরকারসমূহের আচরণে স্পষ্টত:ই মনে হয় আমরা রাজনৈতিকভাবে পিন্ডির গোলাম থেকে দিল্লির গোলামে পরিণত হয়েছি মাত্র।
(২) ভারতের অর্থনৈতিক উন্নতি হচ্ছে আমাদের রক্ত শুষে। দু’দেশের মধ্যে রয়েছে বিশাল বানিজ্যিক ঘাটতি। এছাড়া বাংলাদেশে কর্মরত ৫ লক্ষাধিক ভারতীয় নাগরিক বছরে বাংলাদেশ থেকে নিয়ে যাচ্ছে ২৭১৬ মিলিয়ন ডলার বা ত্রিশ হাজার কোটি টাকা! আমাদের নাগরিকদের কি ভারত এভাবে কাজের সুযোগ দিবে? নিঃসন্দেহে নয়।
(৩) আমাদের যুবসমাজ, তরুণ প্রজন্ম সকলেই আজ ভারতীয় সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের শিকার।
(৪) ভারতীয় মাদকদ্রব্যে আমাদের যুবসমাজ পঙ্গু হয়ে যাচ্ছে। বিশাল সীমান্ত জুড়ে রয়েছে মাদক তৈরির অসংখ্য কারখানা। ভারত সরকারের ঈঙ্গিত/ সম্মতি ছাড়া কি তা কখনো সম্ভব?
(৫) বাংলাদেশে সংখ্যালঘু নির্যাতনের নাটকের কারসাজিতে ভারত সরাসরি যুক্ত থেকে বাংলাদেশের মুসলমানদেরকে নৈতিকভাবে চাপে রেখেছে এবং সে দেশে প্রশাসনের ছত্রছায়ায় মুসলিম নির্যাতন চালাচ্ছে।
(৬) অব্যাহত সীমান্ত হত্যার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের জনগণকে তারা ভীতিগ্রস্ত করে রাখছে।
(৭) দেশ স্বাধীনের পর ভারত এদেশের মসলিন শিল্পের মেশিন সহ অনেক সম্পদ লুটপাট করে নিয়ে গেছে।
(৮) আমাদের ঐতিহ্যের পাটশিল্প ধ্বংস করে কৌশলে ৭০ এর দশকেই পাটশিল্পের বিশ্ববাজার নিজেদের আয়ত্বে নিয়ে নিয়েছে ভারত।
(৯) বাংলাদেশকে একটি স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে “প্রকৃত স্বীকৃতি” না দিয়ে ভারত এদেশকে তাদের করদরাজ্যে পরিণত করার প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছে।
(১০) আমাদের বেরুবাড়ি, দক্ষিণ তালপট্টি ভারত দখল করে নিয়েছে। তিনবিঘা করিডোর এখনো সমস্যা সংকুল।
(১১) পার্বত্য চট্টগ্রামের বিচ্ছিন্নতাবাদী শক্তিকে আশ্রয়, প্রশিক্ষণ, অর্থ ইত্যাদি দিয়ে ভারত মদদ দান করেছে এবং এখনো করে যাচ্ছে। ১৯৯৭ সালের শান্তিচুক্তি একটি “আই-ওয়াশ” মাত্র।
(১২) কূটনীতিক চাপ ও নানান টালবাহানায় ভারত বাংলাদেশে ট্রানজিটরূপী করিডোর আদায় করে নিতে চাচ্ছে অনেক আগে থেকেই।
(১৩) বাংলাদেশে কর্মরত ভারতীয় নাগরিকদের বেশির ভাগই তৈরি পোষাক ও গার্মেন্টস শিল্পে নিয়োজিত। বোদ্ধামহল মনে করেন, পাটশিল্পের মত এদেশের গার্মেন্টস শিল্পও ধ্বংসের জন্য পদক্ষেপ নিয়ে এগুচ্ছে ভারত। তাই, প্রায়ই দেখা যায় বিভিন্ন কারখানার আগুন লাগানোর ঘটনা। গার্মেন্টস এর রপ্তানী বাজার দখলের পাঁয়তারা করছে তারা।
(১৪) অভিন্ন নদীর পানির উজানে বাঁধ তৈরি, ফারাক্কা বাঁধ, তিস্তা বাঁধ পানির প্রবাহ সরিয়ে নিচ্ছে।