পারস্যের এক সত্যসন্ধানী যুবকের গল্প

“বাবা! কিছু লোকের পাশ দিয়ে অতিক্রম করার সময় দেখতে পেলাম তারা তাদের উপাসনালয়ে প্রার্থনা করছে। তাদের ধর্মের যেসব ক্রিয়াকান্ড আমি দেখলাম, তা আমার খুবই ভালো লেগেছে। বেলা ডোবা অব্দি আমি তাদের সাথেই কাটিয়ে দিয়েছি!”

 পারস্যের এক নওজোয়ান। অগ্নিপূজারক। বাবার বিরাট ভূ সম্পত্তি। প্রভাব প্রতিপত্তি, ধর্মীয় নেতৃত্ব, সব দিকেই প্রথম কাতারে থাকা বাবার ছেলে মানেই তো অন্যকিছু! বাবার ছায়া ধরে হাঁটি হাঁটি করে ছেলেও ধরলো ধর্মীয় পুরোহিতের একটা পদ। বাবার আদেশে ধর্মীয় রীতিনীতি পালন করতে একেবারে এক পায়ে খাড়া ছিল সে। ছেলের হাতে দায়িত্ব দিয়ে বাবাও মন দিলেন খামারের কাজে।

 একদিন বাবার খামারে যাওয়া হল না। কি মনে করে ছেলেকে বললেন যেতে। আজ না হয় খামারেই যাক সে। পিতার একান্ত বাধ্য ছেলেও পথ ধরলো খামারের।

 চলতে চলতে পথেই পড়ে এক গির্জা। গির্জা থেকে তখন ভেসে আসছিল খৃষ্টানদের প্রার্থনার শব্দ। সে কখনো গির্জার ইবাদত দেখেনি। কৌতুহলী সে ফারসি যুবক কি মনে করে ঢুকে পড়লেন গির্জায়। মুগ্ধ হয়ে দেখলেন তাদের প্রার্থনা। মনে মনে বলতে লাগলো, “আমরা যে ধর্মের অনুসারী, তা থেকে এ ধর্ম অতি উত্তম।”

 খামার গেল গোল্লায়, নওজোয়ান সেই গির্জায় সারাটাদিন কাটিয়ে দিল! এর মধ্যেই জানতে পারলো এই ধর্মের উৎস নাকি শামে।

 এদিকে সন্ধ্যার পরে ঘরে ফিরে এসে যখন তার বাবাকে সব খুলে বলল, বাবা তো রেগেমেগে অগ্নিশর্মা! “বেটা! ঐ ধর্মে কল্যাণ নেই! তোমার ও তোমার পিতৃপুরুষের ধর্ম তার চাইতে উত্তম।”

 ছেলের আসন্ন ধর্মত্যাগের শঙ্কায় ভীত বাবা বুঝি কেঁপে কেঁপে উঠলেন। ছেলের ভয়াবহ বিপদ টের পেয়ে তার পায়ে ডান্ডাবেড়ি পরিয়ে বেঁধে রাখলেন। একদম যেন রূপালি পর্দার সাসপেন্স ভরা কাহিনী!

 এদিকে ছেলেও অস্থির হয়ে পড়লো। কিছু একটা বোধহয় ঠিক হচ্ছেনা। এ কোন ধর্ম পালন করছে সে? অস্থির যুবক অবশেষে কোনরকমে গির্জায় সংবাদ পাঠালো যে শাম অভিমুখে কোন কাফেলা গেলে তাকে যেন জানানো হয়। কপাল ভালো, মিলেও গেল একটা কাফেলা। সুযোগ আর ছাড়লোনা সে।

 পিতৃপুরুষের ধর্ম, আচার, সংস্কৃতি সব পেছনে ফেলে সেই ফারসি নওজোয়ান পালিয়ে গেল।

 কাফেলার সাথে নওজোয়ানও গিয়ে পৌছালো শামে। সময় নষ্ট করার মানুষ না সে। গিয়েই খবর নিলো এ ধর্মের সবচে জ্ঞানী ব্যাক্তি কে। সবাই বললো বিশপ, গির্জার পুরোহিত।

 যুবকটি খুঁজে খুঁজে ঠিকই বের করে ফেলল বিশপকে। গিয়ে বলল, “আমি খ্রিস্টধর্মের প্রতি আকৃষ্ট হয়েছি। আমার ইচ্ছা, আপনার সাহচর্যে থেকে আপনার খিদমাত করা। আপনার নিকট থেকে শিক্ষালাভ করা ও আপনার সাথে প্রার্থনা করা।”

 বিশপ তাকে গ্রহণ করলেন। যুবক সোৎসাহে বিশপের সেবার নেমে পড়লো। কিন্তু কিছুদিন না যেতেই একটা কঠিন ধাক্কা খেলো সে। এ বিশপ যে আগাগোড়াই অসৎ! বিশপ সবাইকে বয়ান করে বেড়ায় তোমরা দান খয়রাত কর, আল্লাহর রাস্তায় খরচ কর। অথচ কেউ যখন আল্লাহর রাস্তায় খরচা করার জন্যে কিছু তার হাতে তুলে দেয়, সে তা আত্মসাৎ করে বসে। যুবক দেখলো এভাবে দীর্ঘদিন ধরে প্রায় সাত কলসি স্বর্ণ জমিয়ে ফেলেছে বিশপ!

 এমন ধর্মগুরুর প্রতি এক রাশ ঘৃণা নিয়ে যুবক দিনানিপাত করতে লাগলো। হঠাৎই বিশপের দিন ফুরালো। মারা গেল সে। খ্রিষ্টানরা তাকে কবর দিতে এলে যুবক খুলে দেয় তার সমস্ত কুকীর্তির ভান্ডার। সত্য উন্মোচিত হলে সবাই বলে, “আমরা একে দাফন করবোনা”।

 অতঃপর সবাই তখন নতুন আরেক জনকে বিশপের স্থান দিল। এই বিশপ ছিলেন চরিত্রের দিক থেকে অনেক উঁচুতে অবস্থানকারী। যুবক তাকে অত্যন্ত শ্রদ্ধা করতো। সেই পাদ্রীর মৃত্যুর মুহূর্তে যুবক তাকে জিজ্ঞাসা করলো, “জনাব, আপনার মৃত্যুর পর আমাকে কার সাহচর্যে কাটাবার উপদেশ দেবেন?”

তিনি বললেন, “যে সত্য আমি আঁকড়ে ধরেছি, তার ধারক আর কেউ আছে বলে আমি জানিনা। তবে ‘মাওসেলে’ এক ব্যক্তি আছেন, তার নাম অমুক, তিনি এ সত্যের এক বিন্দুও পরিবর্তন করেন নি। তুমি তার সাহচর্য অবলম্বন কর।”

 পাদ্রীর মৃত্যুর পর যুবক আবার নেমে পড়ে তার সত্য সন্ধানী যাত্রায়। মাওসেলে গিয়ে খুঁজে বের করে সেই উস্তাদকে। তাকে সব খুলে বললেন। উস্তাদ তাকে তার সাথেই রেখে দিলেন।

 তবে আল্লাহর ইচ্ছে ছিল তাকে আরো পরীক্ষা করবেন। সেই উস্তাদও মারা গেলেন। মৃত্যুর সময় তার শিয়রে বসে যুবক সেই একই প্রশ্ন করলো, “আপনার মৃত্যুর পর আমাকে কার সাহচর্যে কাটাবার উপদেশ দেবেন?”

 উস্তাদ জবাব দিলেন,“‘নাসসিবীনে’ অমুক নামে একজন ব্যক্তি আছেন। তুমি তার সাথে মিলতে পারো।”

 যুবক আবার নেমে পড়লো নাসসিবীনের উদ্দেশ্যে। কাঙ্ক্ষিত উস্তাদের দেখা পেয়ে তাকে সমস্ত কিছু খুলে বলল। তিনি যুবককে তার কাছে রেখে দিলেন।

 অদ্ভুত জীবন ছিল যুবকের। অদ্ভুত ছিল তার তাকদীর। নাইলে সেই উস্তাদও মারা যাবেন কেন? মৃত্যুর সময় সেই একই প্রশ্ন আবার করলো যুবক, “আপনার মৃত্যুর পর আমাকে কার সাহচর্যে কাটাবার উপদেশ দেবেন?”

 উস্তাদ উত্তর দিলেন,“‘আম্মুরিয়াতে’ এক লোক আছেন। তুমি তার কাছে যাও।”

 যুবক আবার এগিয়ে চললো আম্মুরিয়াতের উদ্দেশ্যে। খুঁজে পেলো সেই ব্যক্তিকে। খুলে বলল সমস্ত কাহিনী। তিনি তাকে তার সাহচর্যে নিয়োগ করলেন।

 তবে আল্লাহর যেন ইচ্ছেই ছিল এই যুবকের জীবনটা আরো অভিযাত্রাময় করে তুলবেন। তার এই উস্তাদও মারা গেলেন। মৃত্যুর আগে যখন যুবক তাকে তার পরবর্তী উস্তাদের ব্যাপারে জিজ্ঞেস করে, তিনি বলেন,

“বৎস! আমরা যে সত্যকে ধরে রেখেছিলাম, সে সত্যের উপর ভূপৃষ্ঠে অন্য কোন ব্যক্তি অবশিষ্ট আছে বলে আমার জানা নেই। তবে অদূর ভবিষ্যতে আরব দেশে একজন নবী আবির্ভূত হবেন। তিনি ইব্রাহীমের দ্বীন নতুনভাবে নিয়ে আসবেন। তিনি তার জন্মভূমি থেকে বিতাড়িত হয়ে বড় বড় কালো পাথরের জমিনের মাঝখানে খেজুর উদ্যান বিশিষ্ট ভূমির দিকে হিজরত করবেন। দিবালোকের ন্যায় সুস্পষ্ট কিছু নিদর্শন থাকবে তাঁর। তিনি হাদিয়ার জিনিস খাবেন, কিন্তু সাদকার জিনিস খাবেন না। তাঁর দু কাঁধের মাঝখানে নবুয়্যাতের মোহর থাকবে। তুমি পারলে সে দেশে যাও।”

 সালমান নামের সেই সত্যসন্ধানী ফারসি যুবক যেন তাঁর জীবনের অন্যতম কঠিন পরীক্ষায় অবতীর্ণ হলেন। কারো কাছে যাওয়ার নেই। কারো কাছে ধর্ম শিক্ষা করার সুযোগ নেই। আপন বলে কেউ নেই। সাথে তার শুধুমাত্র উস্তাদের এক ভবিষ্যৎ বাণী আর তার উপর অগাধ বিশ্বাস। যুবক নতুন করে উঠে দাঁড়ালেন। শুরু হল তার রোমাঞ্চকর এক যাত্রা।

 কোন উস্তাদ নেই। কোন পথপ্রদর্শক নেই। কোন শিক্ষক নেই।

 সত্যানুসন্ধানে অদম্য পারস্য যুবক সালমান (র) কিছুটা থমকে গেলেন। বেশ কিছুটা দিন একা একাই কাটিয়ে দিলেন আম্মুরিয়াতে। কিছুদিন পরেই সেখানে কিছু আরব ব্যবসায়ী এল। সালমান (র) দেখলেন এই তো সুযোগ আরব দেশে যাওয়ার! তিনি ব্যবসায়ীদের দিলেন এক লোভনীয় প্রস্তাব।

 “আপনারা যদি আমাকে সঙ্গে করে আরব দেশে নিয়ে যান, বিনিময়ে আমি আপনাদের আমার এই গরুগুলো আর একটামাত্র যে ভেড়াটা আছে, তা দিয়ে দেব।”

 আরবরা এ প্রস্তাব লুফে নিল। ফলে আরবদের সাথে আরব দেশের উদ্দ্যেশ্যে রওনা হলে সালমান (র)। কিন্তু সালমান (র) কি জানতেন কি অপেক্ষা করছে তার জন্যে?

 মদীনা আর শাম – এই দুই অঞ্চলের মাঝামাঝি ‘ওয়াদি আল কুরা’ নামক স্থানে যখন কাফেলাটি পৌঁছালো, ব্যবসায়ীরা সালমানকে (র) এক ইহুদীর কাছে দাস হিসেবে বিক্রি করে দিল!

 চরম বিশ্বাসঘাতকতার শিকার হয়ে সালমান (র) সেই ইহুদীর দাস হয়ে গেলেন।

 তারপরেও সালমান (র) তার দাসত্ব মেনে নেন। মেনে নেন সত্যকে। বাস্তবতাকে। এরই মাঝে ঘটে আরেক ঘটনা। সেই ইহুদী মালিকের এক চাচাতো ভাই এসে একদিন সালমানকে (র) কিনে নেন। শাপে বর যেমন হয়, সালমানের (র) জন্যেও তা তাই হয়ে গেল। নতুন মালিক তাকে নিয়ে পথ ধরলেন মাদীনা মুনাওয়ারার!

 মদীনা পৌঁছেই যেন সালমানের (র) কাছে দিবালোকের মত সব পরিষ্কার হয়ে গেল। এ যে সেই শহর! “আল্লাহর কসম! আমি যখন এই শহর দেখি, আমি তখনই বুঝে যাই এটাই সেই জায়গা যার কথা আমার উস্তাদ আমাকে বলেছিলেন!”

 সময় বয়ে যায়। সালমান (র) সেই ইহুদীর দাস হিসবে কাজ করতে লাগলেন। আর অপেক্ষা করতে লাগলেন সেই রাসূলের, যিনি ইব্রাহীমের দ্বীন নিয়ে হাজির হবেন। একদিন সালমান (র) খেজুর গাছে উঠে কি যেন করছিলেন। তার মালিক গাছের নিচের বসে ছিল। এমন সময় তার এক চাচাতো ভাই এসে বলল,  “বনি  কীইলা ধ্বংস হোক। তারা কিবা (মদীনা) তে এক লোকের চারপাশে সমবেত হয়েছে, যে কিনা মক্কা থেকে এসে দাবি করছে সে আল্লাহর রাসূল!”

 সালমানের (র) কানে এই কথা যেতেই তিনি রীতিমত কাঁপতে শুরু করলেন। লাফ দিয়ে নেমে এসে তিনি সেই ব্যক্তিকে জিজ্ঞাসা করলেন,“কি বলতে তুমি? কি বললে??”

 এ কথা শুনতেই তার মনিব রাগে ফেটে পড়লো আর ঠাস করে এক চড় বসিয়ে দিল সালমানের (র) গালে। “এর সাথে তোমার সম্পর্ক কি?? যাও কাজে যাও!”

 সালমান (র) এতটুকু দমে গেলেন না। কিছু খেজুর জমা ছিল তার। সেগুলো নিয়ে সেদিন সন্ধ্যাতেই তিনি রাসূলাল্লাহর(সা) কাছে গেলেন। গিয়ে কিছু খেজুর তাকে দিতে গিয়ে বললেন,

 “আমি শুনেছি আপনি একজন পূণ্যবান ব্যক্তি। এ সামান্য কিছু জিনিস আমি সদকার উদ্দেশ্য জমা রেখেছিলাম। আমি দেখছি অন্যদের তুলনায় আপনারাই (রাসূল ও তার সাহাবীগণ) এর অধিক যোগ্য।”

 তীক্ষ্ণ দৃষ্টি দিয়ে সালমান (র) যা লক্ষ্য করলেন, তাতে তার বিস্মিত হবার পালা। রাসূলাল্লাহ (সা) খেজুর গুলো তার সাহাবীদের খেতে নির্দেশ দিলেন। কিন্তু নিজে হাত দিয়েও ধরলেন না। সালমানের (র) মাথায় তখন ঘুরপাক খাচ্ছে, যাক। প্রথম ইঙ্গিত পেয়ে গেছি! উস্তাদ বলেছিলেন,

 “তিনি হাদিয়ার জিনিস খাবেন, কিন্তু সাদকার জিনিস খাবেন না।”

 সালমান (র) ফিরে এলেন। এবার আরো কিছু খেজুর জমা করতে লাগলেন। কিছুদিন পর আবার গেলেন রাসূলাল্লাহর (সা) কাছে। খেজুর এগিয়ে দিলেন।

 “আমি দেখলাম আপনি সদকার জিনিস খান না। তাই এবার কিছু হাদিয়া নিয়ে এসেছি আপনাকে দেয়ার উদ্দেশ্যে।”

 এবার তিনি নিজেও খেলেন, সাহাবীদেরকেও খেতে নির্দেশ দিলেন। সালমান (রা) এর মাথায় তখন ঘুরছিলো,  যাক দ্বিতীয় নিদর্শনটিও মিলে গেলো। রাসূলাল্লাহ(সা) এবার তা নিজেও খেলেন, সাহাবীদেরও খেতে নির্দেশ দিলেন। সালমানের (র) মাথায় তখন

 আবার কিছুদিন গেল। একদিন রাসূলাল্লাহ (সা) তার এক মৃত সাহাবীকে দাফন করছিলেন। তার পরনে ছিল একটা ঢিলেঢালা পোষাক। সালমান (র) এসে তাকে সালাম দিলেন। এবার সালমান (র) শেষ নিদর্শন খুঁজতে লাগলেন।

 “তাঁর দু কাঁধের মাঝখানে নবুয়্যাতের মোহর থাকবে”

 সালমান (র) বার বার রাসূলাল্লাহ (সা) এর পেছনে দৃষ্টি ঘোরাতে লাগলেন। উঁকি ঝুঁকি মারতে লাগলেন। একটাবার যদি দেখা যায়! কিভাবে যে দেখা যায়!

 এদিকে রসূল (সা) সালমানের কাণ্ড দেখছিলেন। তিনি নিজেই ইচ্ছে করে তার চাদরটি পেছন দিক থেকে কিছুটা নামিয়ে দিলেন। এ ছিলো এক অদ্ভুত ও চমকপ্রদ ঘটনা। রসূল এর দুই কাধের সামান্য নিচে বিদ্যমান নবুওতের মোহর দেখতে পেলেন।

 সালমান (র) আর নিজেকে ধরে রাখতে পারলেন না। এত বছরের সাধনা, এত কষ্ট, এত যন্ত্রনা, নিজের সাথে, নিজের কওমের সাথে এত যুদ্ধ, এতটা পথ যাত্রা, এত অপেক্ষার পর যখন চোখের সামনে আল্লাহর একজন সত্য নবী দন্ডায়মান থাকেন, তখন নিজের আবেগকে ধরে রাখা কোন মানুষের পক্ষেই হয়তো সম্ভব ছিল না। সালমান (র) নবুয়্যাতের সেই মোহরের ওপর হুমড়ি খেয়ে পড়লেন আর চুমুতে চুমুতে ভরিয়ে দিলেন। দু চোখে তার অঝোর ধারায় পানি ঝরছে। এ এক অভূতপূর্ব দৃশ্য। এক আবেগময় দৃশ্য। যা কখনই

কেউ দেখেনি। যারা সালমানকে (র) চেনেনা, তারা কখনই বুঝতে পারবেনা এই আবেগের পেছনে কি লুকিয়ে আছে।

 এবার রসূল (সা) তার দিকে ফিরে তাকালেন এবং তার কাহিনী জানতে চাইলেন,

 সালমান (র) তার সমস্ত কাহিনী খুলে বললেন, সেই গির্জা থেকে শুরু করে তার দাসত্ব পর্যন্ত। শুধুমাত্র তাওহীদের সন্ধানে তার বিস্ময়কর এক যাত্রার গল্প। বিস্মিত রাসূলাল্লাহ (সা) তাকে অনুরোধ করলেন যেন তিনি নিজ মুখেই সবাইকে এই গল্প শোনান। সালমানও (র) সব সাহাবীকে তার গল্প শোনালেন। এ যে রূপকথাকেও হার মানায়!

কিন্তু একটা ঝামেলা তখনও ছিল। সালমান (র) তখনও সেই ইহুদীর দাস। রাসূলাল্লাহ (সা) তাকে তার মনিবের সাথে একটা মুক্তি চুক্তি করার পরামর্শ দিলেন। সালমান (র) চুক্তি করলেন। চুক্তি মতে সালমান মনিবকে ৪০ আউন্স স্বর্ণ দেবেন আর ৩০০ খেজুরের চারা লাগিয়ে দেবেন ও তার দেখাশোনা করে দেবেন।

 সালমান (রা) রসূলুল্লাহ (সা) কে এই চুক্তির কথা বললে তিনি সাহাবীদেরকে ডেকে বলেন, “তোমরা তোমাদের এ ভাইকে সাহায্য কর।”

 যাদু ঘটে গেল। সবাই পাঁচ, দশ, বিশ, ত্রিশ করে যে যা পারলেন খেজুরের চারা দিলেন। অবশেষে তার ৩০০ চারা যোগাড় হয়ে গেল। এরপর তিনি রাসূলাল্লাহর (সা) নির্দেশমত গর্ত করলেন। রাসূলাল্লাহ ﷺ নিজে তার সাথে গিয়ে সেখানে নিজ হাতে চারা রোপণ করলেন। চারাগুলো বেড়ে উঠলো।

 কিন্তু তখন স্বর্ণ পরিশোধ করা বাকি। চিন্তিত সালমান (র) একদিন দেখলেন রাসূলাল্লাহ (সা) তার জন্যে মুরগীর ডিমের মত একটা স্বর্ণজাতীয় জিনিস নিয়ে এসে ধরিয়ে দিলেন। বললেন,  “যাও। তোমার চুক্তি মোতাবেক পরিশোধ কর।”

 সালমান (র) বললেন, “এতে কি তা পরিশোধ হবে?”

 রসূলুল্লাহ (সা) বললেন, “ধর। আল্লাহ এতেই পরিশোধ করবেন।”

 সালমান (র) যখন তার এই গল্প বলছিলেন, তখন বললেন, “আল্লাহর কসম! ওজন করে দেখলাম তাতে ৪০ আউন্সই ছিল!”

 অবশেষ চুক্তি পূর্ণ করে সালমান (র) মুক্তি লাভ করলেন। অন্যান্য মুহাজির সাহাবিদের মত সালমানকেও (র) রাসূলাল্লাহ (সা) একজন আনসার সাহাবীর সাথে ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে আবদ্ধ করে দেন। তার ভাই ছিলেন আবু দারদা (রা)।

 এই ছিল সালমান (র) গল্প। সালমান আল ফারাসির (র) গল্প। যে বিস্ময়কর অভাবনীয় অভিযাত্রার গল্প সালমান আল ফারাসির (র) নিজের মুখেই ইবন আব্বাসকে (র) বর্ণনা করেছিলেন। সে এক বিখ্যাত হাদীস।

 তাওহীদের পথে, আল্লাহর ইবাদতের পথে, সত্যের পথে ত্যাগ স্বীকার ও দুঃসহ অভিযাত্রার এক অনবদ্য মহাকাব্য রচনা করেছিলেন সালমান আল ফারিসি (র)। তার এই দুর্গম গিরি কান্তার মরু সদৃশ অভিযাত্রা যুগে যুগে, কালে কালে প্রেরণা যুগিয়েছে সত্য সন্ধানী মানুষদের। জীবনের অর্থ নিয়ে চিন্তাশীলদের। সত্যের পথে অবিচল থাকা আর জীবনে তাওহীদ প্রতিষ্ঠার জন্যে যে ঐতিহাসিক অভিযাত্রায় তিনি নেমেছিলেন, তা আমাদের সকলকেই নতুন করে ভাবতে শেখায়, যে ইসলাম কোন Taken for granted জীবন বিধান নয়।

মুসলিম হতে পারা কোন আল্লাহর পক্ষ থেকে কোন ফ্রী সার্ভিস নয়। এটা অর্জন করতে হয়। ইসলামকে অনুসন্ধান করতে হয়। ইসলামকে চেতনায় ধারণ করতে হয়।

তবেই না আমরা মুসলিম।

সালমান আল ফারাসির (রা) ইসলামের পথে আসার যে মোহনীয় অভিযাত্রার বর্ণনা আমরা পড়েছি, তাতে শুধু অবাক হলেই আমাদের দায়িত্ব শেষ হয়না। এই বিস্ময়কয় অভিযাত্রা থেকে আমাদের শিক্ষা নেয়া প্রয়োজন। এটা এমন এক যাত্রা, যা থেকে সত্যকে অনুসন্ধান করার যে চেতনা আমাদের লালন করা উচিৎ, তার একটা স্পষ্ট ধারণা ও চিত্র আমাদের সামনে ফুটে ওঠে।

 তাহলে কিভাবে আমরা এই অভিযাত্রা থেকে শিক্ষা নেব?

 সালমান আল ফারাসির (রা) ইসলামের পথে যাত্রাকে কয়েকটা ভাগে ভাগ করে ফেলা যায়। প্রতিটা ভাগেই রয়েছে গভীর শিক্ষা। সমস্ত প্রশংসা আল্লাহ তা’লার।

 মানসিকতার প্রশস্ততা

 সালমান আল ফারাসির (রা) যখন প্রথম খৃস্টানদের গির্জায় তাদের প্রার্থনা শুনতে পান, তিনি তাতে আগ্রহী হয়ে ওঠেন ও ভেতরে প্রবেশ করেন। এ থেকে স্পষ্ট ফুটে ওঠে তার প্রশস্ত মানসিকতা। সত্যকে খুঁজে পেতে হলে নিজের মানসিকতাকে প্রশস্ত করার কোন বিকল্প নেই। সালমান আল ফারাসির(রা) যদি তাদের প্রার্থনা দেখে, “আরে ধুর! এইসব কি আজগুবি?” বলে পাশ কাটিয়ে চলে যেতেন, তবে হয়তো তিনি সত্যের সন্ধানে সার্থক হতেন না।

 উপস্থিত প্রমাণকে গুরুত্ব প্রদান

 সালমান আল ফারাসির (রা) সারাটি দিন সেই গির্জায় কাটিয়ে দেন। তাদের প্রার্থনা দেখেন, তাদের কথা শোনেন। তাদের অবলোকন করেন। এতে বোঝা যায় সত্যানুসন্ধানে সময় প্রদানের প্রয়োজনীয়তা। তিনি যদি ঢুকেই এদিক ওদিক চেয়ে “কী সব হাবিজাবি” বলে বের হয়ে যেতেন, তবে তিনি তাদের দ্বীনের ব্যাপারে অল্পই জানতে পারতেন। 

 দ্বীনের মূল অন্বেষণ

 সালমান আল ফারাসির (রা) পাদ্রীদের কাছে জিজ্ঞাসা করেছিলেন তাদের এই ধর্মের উৎস কোথায়? কিভাবে এল? কোথা থেকে এল? তারা জানায় এ ধর্মের উৎস শাম। এখান থেকে দেখা যায় সত্য ধর্ম খুঁজে পেতে অন্যান্য ধর্মের মূল উৎসগুলোর ব্যাপারে জ্ঞানলাভ করা, উৎসের বিশুদ্ধতা সম্বন্ধে জ্ঞাত হওয়ার প্রয়োজনীয়তা।

আপোষহীনতা

 সন্ধ্যায় ঘরে ফিরে এসে বাবাকে সব খুলে বলেন সালমান (রা)। বাবা যথারীতি এর ঘোর বিরোধিতা করলেও সালমান আল ফারাসির (রা) সরাসরি তাকে বলে দেন,  আল্লাহর কসম! এ ধর্ম আমাদের ধর্মের চাইতে উত্তম।

 সালমান (রা) তার পিতাকে অত্যন্ত ভালোবাসতেন ও শ্রদ্ধা করতেন। কিন্তু সত্যের পথে থাকতে তার আবেগকে তিনি প্রাধান্য না দিয়ে স্পষ্টভাষিতার অনুসরণ করেছেন ও অবলীলায় সত্য উচ্চারণ করেছেন।

 অন্যায়ের সামনে মাথা নত না করা

 তার পিতা তাকে বেঁধে রাখার পরেও তিনি বাঁধন খুলে শামে পালিয়ে যান। এতে আমরা দেখতে পাই সত্যকে প্রতিষ্ঠা করতে অন্যায়ের বিরোধিতা করার শিক্ষা। তার পিতা তার ওপর জুলম করলেও তিনি পিতার কাছে মাথা নত না করে বেরিয়ে পড়েন সত্যের উদ্দেশ্যে।

সর্বোত্তম শিক্ষার অন্বেষণ

 সালমান আল ফারাসির (রা) শামে পৌঁছেই শামবাসীকে জিজ্ঞাসা করেন, তোমাদের মধ্যে এই ধর্মের ব্যাপারে সর্বোত্তম কে?

 সালমান চাইলেই যে কারো থেকেই এই ধর্মের দীক্ষা নিতে পারতেন। কিন্তু তিনি খুঁজে বেড়িয়েছেন শ্রেষ্ঠ শিক্ষককে। আমরা খাবার খেতে চাইলেও যেখানে সবচে ভালোটা খেতে চাই, কিন্তু দ্বীনের শিক্ষার ব্যাপারে আমাদের অনেকের সেই দিকে খেয়াল থাকেনা। সালমান ফারিসির এই অনুসন্ধান আমাদের চোখে আঙ্গুল দিয়ে বিশুদ্ধ জ্ঞান অন্বেষার শিক্ষা দান করে।

 বিনয় অমায়িকতা

 সালমান আল ফারাসির (রা) যখন বিশপকে সামনে পেলেন, তিনি তাকে তার শিক্ষক হতে অনুরোধ করলেন। বিনিময়ে তিনি তার সেবক হিসেবে নিজেকে নিয়োজিত করার প্রস্তাব দিলেন। এখান থেকে দেখা যায় তার অমায়িকতা ও বিনয়ের দৃষ্টান্ত। এটা প্রত্যেক জ্ঞান অন্বেষীর জন্যে কর্তব্য, যে জ্ঞান অন্বেষণের জন্যে বিনয়ী হতে হবে। অমায়িক হতে হবে। অতি আবেগ কিংবা ঔদ্ধত্য অন্তরে লালিত করে জ্ঞান অন্বেষণ কখনো সফল হয়না।

 বিশপের অসততা সালমানের সিদ্ধান্ত

 সালমান (রা) কিছুদিন অরেই বিশপের অসততা দেখতে পেলেন। তার মন ভেঙ্গে গেল। হতাশ হয়ে পড়লেন। কিন্তু তিনি কি সেই ধর্মের দীক্ষা ছেড়ে দিয়েছিলেন? সত্যের সন্ধানের যাত্রা থামিয়ে দিয়েছিলেন? “আরে এদের আলেমই তো ঠিক নাই! ধর্ম কি ঠিক থাকবে!” এই চিন্তা করে তিনি আবার তার দেশে ফিরে যাননি। বরং তিনি এগিয়ে গেছেন নতুন কোন শিক্ষকের খোঁজে, যিনি তাকে সঠিকভাবে শিক্ষা দেবেন। অনেকেই আছেন, যারা কতিপয় মুসলিমের অসৎ আচরণ দেখে ইসলামকে ঘৃণা করতে শেখেন। তাদের জন্য সালমানের এই বিচক্ষণ সিদ্ধান্ত একটি প্রাণবন্ত শিক্ষণীয় উদাহরণ।

 ধৈর্যশীলতা

 সালমান (রা) একের পর এক উস্তাদের কাছে ছুটে গেছেন সত্যের দেখা পাওয়ার জন্যে। তার উস্তাদরা একের পর এক মারা গেছেন, তিনি নতুন উদ্যমে পরবর্তী উস্তাদের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়েছেন। এতে সত্যকে খুঁজে নিতে তার অপরিসীম ধৈর্য আমাদের ধৈর্যশীলতার শিক্ষা দেয়। অনেকেই সত্য দ্বীনের ব্যাপারে দুই চার লাইন পড়েই মনে করেন হয়ে গেছে। আর দরকার নাই। আমি অনেক জেনেছি। অথচ তারা কতই না বিভ্রান্তিতে আছে!

 লজ্জাকে প্রশ্রয় না দেয়া

 সালমান আল ফারাসির (রা) যখন দাস হিসেবে বিক্রি হয়ে যান, তখন তিনি অপমানিত হলেও তা প্রকাশ না করে এগিয়ে গেছেন সামনে। এমনকি মাদীনায় যখন তাকে নিয়ে যাওয়া হয়, তার মাথায় ছিল এই সেই শহর যেখানে আল্লাহর রাসূল (সা) আসবেন। সেই ক্ষণের জন্যে তিনি দিন গুনছিলেন আর দাসত্ব করছিলেন এক ইহুদীর। শুধু তাই না। যখন প্রথম রাসূলাল্লাহ (সা) এর মাদীনা আসার খবর লাভ করেন, তিনি গাছ থেকে নেমে দৌড়ে খবর প্রদানকারীর কাছে যান ও ফলশ্রুতিতে তার মনিবের চড় খান। এত কিছু অপমানজনক ঘটনার পরেও তিনি ধীরে সুস্থে রাসূলাল্লাহকে (সা) পরীক্ষা করার সিদ্ধান্ত নেন। কারণ তার সমস্ত চিন্তার কেন্দ্র জুড়ে শুধুই সত্যানুসন্ধান।

 পূর্বে প্রেরিত কিতাবের তথ্য যাচাই

 সালমান (রা) তার উস্তাদের কাছ থেকে ইঞ্জিল ও তাওরাতে রাসূলাল্লাহর (সা) ব্যাপারে যা যা বলা ছিল তা বাস্তবতার সাথে মিলিয়ে দেখলেন। এবং হুবহু মিল পেয়ে তার নব্যুয়াতের ব্যাপারে নিশ্চিত হলেন। সালমান (রা) এর এই নীতি অনুসরণ না করার ফলে বর্তমানে বেশ কিছু ধর্ম বিকৃত হয়ে গেছে। যদিও তাদের আলিমরা ঠিকই রাসূলাল্লাহর (সা) ব্যাপারে তাদের কিতাবে উল্লিখিত ভবিষ্যৎ বাণীর ব্যাপারে অবগত। কিন্তু বাস্তবতার সাথে মিলিয়ে দেখতে তারা একেবারেই রাজি নন। ফলে তারা আল্লাহর ক্রোধ অর্জন করে অভিশপ্ত জাতিতে পরিণত হয়েছে।

সত্যানুসন্ধানে একাগ্রতা

 সালমান আল ফারাসির (রা) চাইলেই অল্প পরিশ্রমেই তার যাত্রা শেষ করে দিতে পারতেন। কিন্তু তিনি সত্যের একেবারে নিকটে না পৌঁছে যাত্রা বিরতি করতে রাজি ছিলেন না। আবু হুরাইরার (রা) এর সেই হাদীসেই তা ফুটে উঠেছে, যেখানে রাসূলাল্লাহ ﷺ বলেছিলেন  “তার নামে শপথ যার হাতে আমার প্রাণ! ‘ঈমান’ যদি আস সুরাইয়া (সপ্ত তারকারাজি) এর কাছেও থাকতো, তাহলে এদের (সালমান আল ফারিসি (রা) এর মত) মানুষগুলো ঠিকই তা খুঁজে নিত।”

 এর মাধ্যমে স্পষ্ট বোঝা যায় সত্যের সন্ধান পেতে কতটা ইখলাস প্রয়োজন, কতটা একাগ্রতা প্রয়োজন। সত্য যেখানেই থাকুক, আমি তার সন্ধান নিয়ে ছাড়বই – এই মানসিকতার দীক্ষা আমরা পাই সালমান আল ফারিসির (রা) জীবন থেকে।

 আল্লাহ আমাদের সবাইকে সালমান আল ফারাসির (রা) জীবনের এই দুঃসাহসিক ও বিস্ময় জাগানিয়া সত্যের পথে যাত্রার গল্প থেকে সঠিক শিক্ষা লাভ করার তাওফীক দান করুন।


Leave a comment