‘ফিতরাত’ শব্দটি আরবি ভাষা থেকে উদ্ভূত, যার অর্থ প্রকৃতিগত প্রবৃত্তি, স্বাভাবিক গুণাবলী বা সৃষ্টিগতভাবে প্রাপ্ত চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য। ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে ফিতরাত হলো মানুষের সেই স্বাভাবিক প্রবৃত্তি, যা আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস ও তাঁর অস্তিত্ব অনুভবের ক্ষমতা নিয়ে জন্মগ্রহণ করে। এটি এমন এক অবিনশ্বর সত্য, যা মানুষের অন্তরে প্রোথিত থাকে।
মানুষের জন্মগতভাবে কিছু স্বাভাবিক অনুভূতি ও আবেগ আছে যা তাকে স্রষ্টার অস্তিত্ব উপলব্ধি করতে সাহায্য করে। উদাহরণস্বরূপ, একজন পিতা বা মাতার সন্তানের প্রতি অগাধ ভালোবাসা, মহাবিশ্বের বিশালতা ও সৌন্দর্যের প্রতি বিস্ময়বোধ, কিংবা জীবনের সূক্ষ্মতা ও নান্দনিকতায় সৃষ্টিকর্তার নিপুণতার ছাপ—এসবই ফিতরাতের বহিঃপ্রকাশ। এ কারণেই, ধর্মবিশ্বাস বা নাস্তিকতার প্রশ্নে অনেক বিতর্ক থাকলেও, বেশিরভাগ মানুষই জীবনের কোনো না কোনো পর্যায়ে এক সৃষ্টিকর্তার উপস্থিতি অনুভব করে।
যদিও কিছু মানুষ সৃষ্টিকর্তার অস্তিত্বকে অস্বীকার করে এবং নিজেদের নাস্তিক হিসেবে পরিচিতি দেয়, তবুও তাদের অন্তরের গভীরে একধরনের শূন্যতা বা অপূর্ণতার অনুভূতি কাজ করে। কারণ ফিতরাত এমন এক অভ্যন্তরীণ প্রবৃত্তি, যা মানুষের আত্মা ও চেতনায় প্রোথিত। এটি তাদের মনে এক ধরনের প্রশ্নের জন্ম দেয়: “আমরা কোথা থেকে এসেছি?”, “আমাদের অস্তিত্বের উদ্দেশ্য কী?”, কিংবা “মৃত্যুর পরে কী হবে?”।
এই শূন্যতা ও অস্থিরতার কারণেই নাস্তিকতার পথে থাকা অনেকেই একসময় ধর্মীয় বিশ্বাসের দিকে ফিরে আসার আকাঙ্ক্ষা বোধ করে। কারণ তাদের অন্তরের ফিতরাত, যা চিরন্তন সত্যের অনুসন্ধান করে, তা তাদেরকে স্রষ্টার প্রতি মনোযোগী হতে উদ্বুদ্ধ করে। ইসলাম ধর্মের একটি মৌলিক দিক হলো এই ফিতরাতকে স্বীকৃতি দেওয়া এবং এটিকে সঠিক পথনির্দেশনা প্রদান করা।
অতএব, ফিতরাত মানবজীবনের এক অপরিহার্য ও স্বাভাবিক উপাদান, যা স্রষ্টার সাথে মানুষের আত্মিক সংযোগ স্থাপনের মৌলিক ভিত্তি। এটি মানুষকে সত্যের দিকে আহ্বান জানায় এবং তার জীবনের গভীরে স্থাপিত এক অনন্য অন্তর্দৃষ্টি।
নাস্তিকতা এবং ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি
ইসলামে নাস্তিকতা বা সৃষ্টিকর্তার অস্তিত্ব অস্বীকার করাকে একটি মানবিক ব্যাধি হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। কারণ ইসলামের দৃষ্টিতে মানুষ প্রকৃতিগতভাবে (ফিতরাত অনুযায়ী) সৃষ্টিকর্তার অস্তিত্ব উপলব্ধি করার যোগ্যতা নিয়ে জন্মগ্রহণ করে। তবে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা মানুষের ওপর এমন কোনো বিষয় চাপিয়ে দেননি যার জন্য তারা সম্পূর্ণ দায়বদ্ধ হতে পারে না। এ কারণে ইসলামে নাস্তিকদের প্রতি আল্লাহর দৃষ্টিভঙ্গি অত্যন্ত সহনশীল এবং কুরআনে তাদের সম্পর্কে কঠোর বক্তব্য কমই পাওয়া যায়।
কুরআনে আল্লাহ্ বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন মুমিন ও মুশরিকদের ওপর। মুমিনরা আল্লাহর অস্তিত্ব ও তাঁর একত্ববাদে বিশ্বাস স্থাপন করে এবং তাঁর নবী ও রসূলদের প্রতি আনুগত্য প্রদর্শন করে। অন্যদিকে, মুশরিকরা আল্লাহর অস্তিত্বকে স্বীকার করলেও তাঁর সঙ্গে অন্যান্য সত্ত্বাকে শরিক করে বা অংশীদার বানায়। এই ধরনের শিরক বা অংশীদারিত্ব ইসলামে সবচেয়ে বড় পাপ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।
তৃতীয় শ্রেণির মধ্যে কাফিররা অন্তর্ভুক্ত, যারা সরাসরি নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের প্রেরিত বার্তাকে প্রত্যাখ্যান করে এবং ইচ্ছাকৃতভাবে সত্যকে অস্বীকার করে। তারা কুরআনের বাণীকে অগ্রাহ্য করে এবং প্রায়শই নিজেদের বিশ্বাস বা অবিশ্বাস দিয়ে ইসলামের মূলনীতির বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়।
নাস্তিকরা যদিও সৃষ্টিকর্তার অস্তিত্ব অস্বীকার করে, ইসলামে তাদের জন্য কড়া শাস্তির নির্দেশনা সরাসরি নেই। বরং ইসলাম নাস্তিকদের সঠিক পথে ফিরে আসার সুযোগ এবং প্রজ্ঞার সাথে আলাপের মাধ্যমে তাদের দাওয়াত দেওয়ার শিক্ষা দেয়। আল্লাহ্ কুরআনে বলেছেন,
“তোমার প্রভুর পথে আহ্বান কর প্রজ্ঞা ও উত্তম উপদেশের মাধ্যমে এবং তাদের সঙ্গে বিতর্ক কর উত্তম পদ্ধতিতে।”(সুরা আন-নাহল: ১২৫)
এই আয়াতের মাধ্যমে বোঝা যায়, নাস্তিক বা যেকোনো অবিশ্বাসী ব্যক্তির সঙ্গে আলাপচারিতায় ধৈর্য, সহনশীলতা এবং উত্তম পদ্ধতির প্রয়োজন।
ইসলামের মূলনীতি অনুযায়ী, একজন নাস্তিকও তার ধর্মীয় স্বাধীনতা নিয়ে সমাজে বসবাস করতে পারে। ইসলামে কাউকে জোর করে ধর্মে আনতে নিষেধ করা হয়েছে:
“ধর্মে কোনো জোর-জবরদস্তি নেই।” (সুরা আল-বাকারা: ২৫৬)
তবে নাস্তিকতা ইসলামে কাম্য নয় কারণ এটি মানুষকে তার সৃষ্টিকর্তা এবং জীবনের মূল উদ্দেশ্য থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। ইসলামের দৃষ্টিতে, আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করা এবং তাঁর পথ অনুসরণ করা মানবজীবনের মূল লক্ষ্য। যে ব্যক্তি নাস্তিকতা থেকে ফিরে আসে এবং আল্লাহর পথে ফিরে আসে, তাকে আল্লাহ্ ক্ষমা করেন এবং তার জন্য জান্নাতের দরজা খুলে দেন।
সুতরাং, ইসলামে নাস্তিকতার প্রতি সহনশীল দৃষ্টিভঙ্গি থাকলেও, ইসলাম তার অনুসারীদের আহ্বান করে যেন তারা ফিতরাতের প্রকৃত পথে ফিরে আসে এবং সৃষ্টিকর্তার অস্তিত্ব ও তাঁর প্রতি আনুগত্যের মাধ্যমে জীবন পরিচালনা করে।
ইসলামের প্রতি বিদ্বেষের প্রবণতা
বাংলাদেশের নাস্তিকদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ নাস্তিকতার আড়ালে ইসলামবিদ্বেষী মনোভাব পোষণ করে, যা শুধু ধর্মে অবিশ্বাসের পর্যায়ে সীমাবদ্ধ নয়। তারা ইসলাম ধর্মের মূলনীতি, শিক্ষা, বিধান, এমনকি ইসলামী ইতিহাস এবং নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ব্যক্তিত্ব নিয়ে কটাক্ষ করে থাকে। এই বিদ্বেষমূলক আচরণ তাদের কার্যক্রমে স্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে, এবং এটি অনেক সময় সমাজে অস্থিরতা সৃষ্টি করে।
ধর্মে অবিশ্বাস বা নাস্তিকতা ব্যক্তিগত দৃষ্টিভঙ্গি হতে পারে, যা একজন মানুষের চিন্তাধারা বা অভিজ্ঞতার উপর নির্ভর করে। যদি কেউ প্রকৃত নাস্তিক হয়, তাহলে তাদের ধর্ম সম্পর্কে নিরপেক্ষ থাকা উচিত এবং সমস্ত ধর্মের প্রতি সমান মনোভাব পোষণ করা উচিত। কিন্তু বাস্তবিক ক্ষেত্রে দেখা যায়, বাংলাদেশে নাস্তিক পরিচয়ে থাকা একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর বিদ্বেষ প্রায় একচেটিয়াভাবে ইসলামকে লক্ষ্যবস্তু করে। তারা অন্যান্য ধর্ম সম্পর্কে আলোচনা বা সমালোচনায় তেমন আগ্রহী নয় এবং প্রায়শই ইসলামকে আক্রমণ করার জন্য তাদের শক্তি ও মনোযোগ নিবদ্ধ রাখে।
এই গোষ্ঠী ইসলামবিরোধী কর্মকাণ্ডে বিভিন্ন পন্থা অবলম্বন করে:
ইসলামী শিক্ষা বিকৃত করা: কুরআনের আয়াত এবং হাদিসের অংশবিশেষকে ভুলভাবে উপস্থাপন করা হয়, যেন ইসলামের মূলনীতি সম্পর্কে বিভ্রান্তি ছড়ানো যায়।
তথ্যগত বিকৃতি: ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলোকে বিকৃতভাবে ব্যাখ্যা করে তারা সাধারণ মানুষের মধ্যে বিদ্বেষ ছড়ায়।
অপমানমূলক বক্তব্য: তারা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে ইসলামের পবিত্র ব্যক্তিত্বদের নিয়ে কটাক্ষ করে, যা ধর্মপ্রাণ মানুষদের অনুভূতিতে আঘাত করে।
গোষ্ঠীগত সহিংসতা উস্কে দেওয়া: তারা ধর্মের নামে বিদ্বেষমূলক প্রচার চালিয়ে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে বিভেদ তৈরির চেষ্টা করে।
যদি এই গোষ্ঠী সত্যিকার অর্থে নাস্তিকতায় বিশ্বাসী হতো এবং সব ধর্মের প্রতি একইরকম নেতিবাচক মনোভাব প্রকাশ করত, তবে এটি একটি দার্শনিক অবস্থান বলে বিবেচিত হতে পারত। কিন্তু তাদের বিদ্বেষ শুধুমাত্র ইসলামকে লক্ষ্য করে হওয়ায় এটি স্পষ্টভাবে পক্ষপাতদুষ্ট এবং ইসলামবিদ্বেষী একটি কর্মসূচি।
তাদের এই আচরণ শুধু ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের জন্য অপমানজনক নয়; এটি সমাজে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতিকে বিঘ্নিত করারও একটি প্রধান কারণ। ইসলাম ধর্ম, যা শান্তি, সহনশীলতা এবং মানবিক মূল্যবোধের শিক্ষা দেয়, সেটিকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে আক্রমণ করা সমাজে অসন্তোষের জন্ম দেয় এবং বিভিন্ন গোষ্ঠীর মধ্যে দ্বন্দ্ব উসকে দেয়।
তবে ইসলাম শান্তির ধর্ম, এবং এটি এর অনুসারীদের শান্তি ও প্রজ্ঞার সঙ্গে অন্যদের মোকাবিলা করার নির্দেশনা দেয়। কুরআনে আল্লাহ্ বলেছেন:
“তোমরা উত্তম পন্থায় বিতর্ক করো এবং উত্তম কথার মাধ্যমে তাদের আহ্বান করো।” (সুরা আন-নাহল: ১২৫)
এ কারণে, ইসলামের প্রতি এই ধরনের বিদ্বেষ মোকাবিলার জন্য মুসলমানদের ধৈর্যশীল ও প্রজ্ঞাবান হতে হবে এবং জ্ঞান ও যুক্তির মাধ্যমে সত্য প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করতে হবে। ইসলামের শিক্ষার সৌন্দর্য এবং এর মানবিকতা তুলে ধরার মাধ্যমে বিদ্বেষমূলক প্রচারণাকে প্রতিহত করা যেতে পারে।
ইসলামের প্রতি পক্ষপাতদুষ্ট মনোভাব
এই ধরনের দ্বৈত মনোভাব এবং একপেশে সমালোচনা ইসলামের প্রতি পক্ষপাতদুষ্ট মনোভাব এবং ইসলামবিদ্বেষের একটি স্পষ্ট উদাহরণ। যখন তারা ইসলামকে আক্রমণ করে এবং কেউ ইসলামকে রক্ষায় প্রতিক্রিয়া জানায়, তখন তারা খুবই চ্যালেঞ্জিং প্রশ্ন করে, যেমন, “ইসলাম এত দুর্বল কেন যে সামান্য সমালোচনা সহ্য করতে পারে না?” কিন্তু তাদের এই প্রশ্নটি একেবারেই পক্ষপাতদুষ্ট, কারণ তারা একই ধরনের সমালোচনা অন্য কোনো ধর্মের জন্য করে না। এভাবে তারা ইসলামের প্রতি অবজ্ঞা এবং এক ধরনের তুচ্ছতাচ্ছিল্য মনোভাব প্রকাশ করে, যা অন্য ধর্মের ক্ষেত্রে দেখা যায় না।
ইসলামিক শাস্তি নিয়ে তারা যখন পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা সমালোচনা করে, তখন তাদের অবস্থান আরো স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তারা ইসলামিক শাস্তি, যেমন শরিয়া আইন বা ইসলামী দৃষ্টিতে অপরাধীদের শাস্তির বিধান, নিয়ে অনেক সময় অত্যন্ত তীব্র সমালোচনা করে। তারা ইসলামী সমাজ ব্যবস্থার কাঠামোকে দুর্বল বা মানবাধিকারের পরিপন্থী হিসেবে উপস্থাপন করার চেষ্টা করে। কিন্তু যখন তাদের নিজেদের সমাজে অপরাধের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তির প্রয়োজন দেখা দেয়, তখন তারা সেদিক থেকে নিজেদের অবস্থান পালটে ফেলতে পারে এবং মৃত্যুদণ্ড বা কঠোর শাস্তি দাবি করতে থাকে। এটি একটি দ্বৈত মানদণ্ডের উদাহরণ, যেখানে তাদের নিজেদের অবস্থান এবং ইসলামিক শাস্তি সম্পর্কে দৃষ্টিভঙ্গি শুধুমাত্র রাজনৈতিক বা সামাজিক প্রেক্ষাপটে পরিবর্তিত হয়।
এছাড়াও, মুসলিম নারীদের হিজাব পরার প্রতি তাদের পক্ষ থেকে যে ধরনের বিদ্বেষপূর্ণ মনোভাব দেখা যায়, তা খুবই দৃষ্টিকটু। তারা হিজাব পরাকে মুসলিম নারীদের বন্দিত্ব বা স্বাধীনতার অভাব হিসেবে উপস্থাপন করে, অথচ একই ধরনের পোশাক বা প্রথা যখন অন্য ধর্মের নারীরা অনুসরণ করে, তখন তাদের বিরুদ্ধে কোনো সমালোচনা করা হয় না। উদাহরণস্বরূপ, নানদের সন্ন্যাসী পোশাক বা হিজাব পরার বিষয়টিকে তারা কোনো বাধা হিসেবে দেখেন না, যদিও ইসলামিক হিজাবকে তারা বন্দিত্বের প্রতীক হিসেবে তুলে ধরে। এটি স্পষ্টভাবে দেখায় যে তাদের সমালোচনার উদ্দেশ্য শুধুমাত্র ইসলাম, অন্য কোনো ধর্ম বা সংস্কৃতির প্রতি তাদের এমন কোনো বিদ্বেষপূর্ণ মনোভাব নেই।
ইসলামিক পোশাক, যেমন পুরুষদের ইসলামিক লেবাস বা মুসলিম নারীদের হিজাব পরা, এটি তাদের বিশ্বাসের প্রতীক এবং ধর্মীয় শৃঙ্খলার অংশ। তবে, যখন তারা ইসলামের পোশাক নিয়ে কটাক্ষ করে, তখন তাদের মধ্যে এক ধরনের অসংগতি দেখা যায়। একই ধরনের পোশাক বা লেবাস যখন অন্য ধর্মীয় সম্প্রদায়ের মধ্যে জনপ্রিয় বা গ্রহণযোগ্য, তখন তারা তার বিরুদ্ধে সমালোচনা করতে গড়মিল করে না। উদাহরণস্বরূপ, হিন্দু পুরুষদের ধুতি বা গেরুয়া পোশাক, যা ঐতিহ্যগতভাবে তাদের সংস্কৃতির অংশ, তা নিয়ে তাদের কোনো আপত্তি বা সমালোচনা দেখা যায় না। এটি পরিষ্কারভাবে দেখায় যে তাদের উদ্দেশ্য শুধুমাত্র ইসলামকে আক্রমণ করা এবং অন্য ধর্মের প্রতি তাদের মনোভাব অত্যন্ত নমনীয় বা সহনশীল।
এই দ্বৈত মানদণ্ড এবং পক্ষপাতদুষ্ট মনোভাব সমাজে বিভাজন সৃষ্টি করে এবং ধর্মীয় সংহতি এবং শান্তির প্রতি একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দাঁড়ায়। ইসলামের প্রতি এই ধরনের অসংগত আচরণ, যেখানে ধর্মীয় বিশ্বাস এবং প্রথার প্রতি ভ্রান্ত ধারণা ও অসম্মান প্রকাশ করা হয়, তা সমগ্র মানব সমাজের জন্য ক্ষতিকর। ইসলাম, যদিও অত্যন্ত সহনশীল এবং শান্তিপূর্ণ ধর্ম, তথাপি এর প্রতি এই ধরনের আক্রমণ এবং কটাক্ষ সমাজের স্থিতিশীলতা এবং শান্তির জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়ায়।
নাস্তিকতার বিপরীতে ইসলামের অনন্য উদারতা
ইসলামে ধর্মীয় সহিষ্ণুতা এবং নৈতিকতার প্রতি গুরুত্ব অত্যন্ত উচ্চ, যা সমাজে শান্তি, শ্রদ্ধা এবং সবার প্রতি ভালোবাসা স্থাপন করতে সহায়ক। আল্লাহ কুরআনে মুসলিমদের এই বিষয়ে স্পষ্ট নির্দেশনা দিয়েছেন, যাতে তারা তাদের বিশ্বাসে দৃঢ় থাকার পাশাপাশি অন্যদের বিশ্বাস ও ধর্মের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকে। এ প্রসঙ্গে কুরআনে আল্লাহ্ বলেন:
“বিদ্বেষ প্রকাশ পেয়েছে তাদের বাইরে থেকে, কিন্তু তাদের অন্তরে যা লুকানো, তা আরও ভয়ঙ্কর।” (সুরা আল-আলে ইমরান: ১۱۸)
এই আয়াতটি স্পষ্টভাবে দেখায় যে, মানুষের বাহ্যিক আচরণ, কথাবার্তা বা মনোভাবের তুলনায় তাদের অন্তরের চিত্র আরো ভয়ঙ্কর হতে পারে। অর্থাৎ, বাহ্যিকভাবে কেউ যদি শান্তিপূর্ণ এবং শ্রদ্ধাশীল হতে চায়, তবুও তার অন্তরে যদি বিদ্বেষ বা ঘৃণা থাকে, তবে তা আরো বিপজ্জনক। ইসলাম আল্লাহর পথ অনুসরণকারী ব্যক্তির জন্য এই ধরনের অন্তরগত ঘৃণা বা বিদ্বেষের বিরুদ্ধে সতর্ক করে।
ইসলামে অন্যান্য ধর্মের প্রতি সহিষ্ণুতা এবং শ্রদ্ধা প্রদর্শন করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কুরআনে এমন বহু আয়াত রয়েছে যা মুসলমানদের নির্দেশনা দেয় যেন তারা অন্য ধর্মাবলম্বীদের সঙ্গে সদ্ভাব বজায় রাখে এবং তাদের ধর্মীয় বিশ্বাসের প্রতি শ্রদ্ধা জানায়। উদাহরণস্বরূপ:
“তোমরা তাদের ধর্মের প্রতি কটাক্ষ করো না, যেন তারা আল্লাহকে অবমাননা না করে অজ্ঞতার কারণে।” (সুরা আল-আনআম: ১০৫)
এই আয়াতে আল্লাহ স্পষ্টভাবে বলেছেন যে, মুসলমানদের উচিত অন্য ধর্মের অনুসারীদের প্রতি কটাক্ষ করা বা তাদের ধর্মকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করা থেকে বিরত থাকা। কারণ, যখন কেউ অন্যের ধর্মকে অবমাননা করে, তখন সেটি অন্য পক্ষের দ্বারা আল্লাহকে অবমাননা বা অসম্মান করা হতে পারে। ইসলামে যেহেতু মানুষের জন্য শান্তি এবং সম্মানজনক সহাবস্থান শিক্ষা দেয়, তাই অন্য ধর্মের প্রতি অবজ্ঞা বা বিদ্বেষ প্রকাশ করা ইসলামের দৃষ্টিতে শত্রুতা এবং সামাজিক অস্থিরতার কারণ হতে পারে।
এছাড়া, ইসলামের শিক্ষা অনুসারে, মুসলিমদের নিজস্ব ধর্মীয় বিশ্বাসের প্রতি দৃঢ় থাকতে হবে, তবে তাদের অন্য ধর্মাবলম্বীদের প্রতি শ্রদ্ধা এবং সহনশীলতা বজায় রাখতে হবে। কুরআনে বলা হয়েছে:
“তোমাদের জন্য তোমাদের ধর্ম, আমাদের জন্য আমাদের ধর্ম। (সুরা আল-কাফিরুন: ৬)
এটি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আয়াত, যা মুসলমানদের অন্য ধর্মাবলম্বীদের প্রতি সহনশীলতা এবং তাদের বিশ্বাসের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের আহ্বান জানায়। এটি কেবল ইসলামের পক্ষ থেকে নয়, বরং মানবাধিকার এবং শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের প্রতি ইসলামের অঙ্গীকারকে প্রকাশ করে।
ইসলামে কোনো ধর্মকে আক্রমণ করা বা বিদ্বেষ প্রদর্শন করা নিষিদ্ধ। বরং ইসলাম মানবাধিকার এবং ধর্মীয় স্বাধীনতার প্রতি গভীর শ্রদ্ধাশীল। ইসলামের শাস্ত্রীয় নীতি অনুযায়ী, যদি কোনো মুসলিম কাউকে ধর্মীয়ভাবে আক্রমণ করে বা অন্যের ধর্মকে অপমান করে, তবে সে আল্লাহর ন্যায় বিচার ও শাস্তির মুখোমুখি হতে পারে। আল্লাহ নিজেই জানেন মানুষের অন্তর কী ধারণ করে, এবং তিনি তাদের জন্য সবথেকে ভাল নির্দেশনা দেন।
অতএব, ইসলামে ধর্মীয় সহিষ্ণুতা, শ্রদ্ধা এবং শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের প্রতি একান্ত গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। অন্য ধর্মের প্রতি কটাক্ষ বা বিদ্বেষ প্রকাশ করা ইসলামের মূল নীতির বিরোধী, এবং মুসলমানদের উচিত আল্লাহর নির্দেশনা অনুযায়ী অন্য ধর্মের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা।
একজন প্রাক্তন নাস্তিকের ফিরে আসার গল্প
বাংলাদেশের একজন প্রাক্তন নাস্তিক, যিনি পরবর্তীতে ইসলামে ফিরে এসেছেন, তার এই অভিজ্ঞতা একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ, যা দেখায় যে ইসলামের শিক্ষা মানুষের অন্তরে এক গভীর ও শক্তিশালী পরিবর্তন আনতে সক্ষম। তিনি বলেছিলেন যে, তিনি অনেক কিছু বলেছিলেন কুরআনের বিরুদ্ধে, কিন্তু একদিন সিদ্ধান্ত নিলেন নিজে কুরআনটি পড়ে দেখবেন। পড়তে পড়তে তার চোখ খুলে গেল এবং তিনি অনুভব করলেন যে, কুরআনের প্রতিটি বাক্য তাকে গভীরভাবে স্পর্শ করছে। এক সময় তিনি নিজেই আবিষ্কার করলেন যে, তিনি কুরআনের প্রতিটি শব্দে নতুন একটি দৃষ্টিভঙ্গি এবং গভীরতা দেখতে পাচ্ছেন। এমনকি তিনি কুরআনের পুরো অংশ দাগিয়ে ফেলেছিলেন, কারণ প্রতিটি বাক্যই তার কাছে মূল্যবান এবং পরিপূর্ণ বলে মনে হচ্ছিল। এটি তার জীবনে এক অবিশ্বাস্য পরিবর্তনের সূচনা ছিল, যা তাকে এক নতুন সত্যের পথে পরিচালিত করেছিল।
এই অভিজ্ঞতা থেকে দুটি গুরুত্বপূর্ণ দিক বেরিয়ে আসে:
১. ইসলামের শিক্ষা সকল মানুষের জন্য: এই ঘটনা থেকে বোঝা যায়, ইসলামের শিক্ষা শুধুমাত্র মুসলিমদের জন্য নয়, বরং নাস্তিকসহ সব মানুষের জন্যই এক ধরনের করুণাময় এবং গভীরভাবে প্রভাবিত করার ক্ষমতা রাখে। একজন মানুষ যখন সৃষ্টিকর্তার অস্তিত্বে অবিশ্বাসী থাকে, তখন তাকে ইসলামের সঠিক শিক্ষা বা বার্তা পৌঁছালে তার অন্তরে একটি নতুন দৃষ্টি এবং বিশ্বাসের সৃষ্টি হতে পারে। এটি প্রমাণ করে যে, ইসলাম এমন একটি ধর্ম যা মানুষের অন্তরকে সত্যের পথে পরিচালিত করার শক্তি রাখে, অবিশ্বাসীদেরও।
২. আধ্যাত্মিক পরিবর্তন ও চিন্তাধারায় উন্নতি: যখন একজন নাস্তিক কুরআন পড়তে শুরু করেন, তখন শুধুমাত্র ধর্মীয় বিষয় নয়, বরং আধ্যাত্মিক, নৈতিক এবং সামাজিকভাবে সমৃদ্ধ একটি দৃষ্টিভঙ্গি তাকে অর্জন করতে সহায়ক হয়। কুরআনের বার্তা মানুষের অন্তরে পরিবর্তন আনে, কারণ তা একটি অত্যন্ত সুন্দর, সুবোধ, শান্তিপূর্ণ এবং ন্যায়পরায়ণ জীবনযাপনের পথে পরিচালনা করে। এই পরিবর্তন কোনো বাহ্যিক বাহিনী দ্বারা নয়, বরং অন্তরের গভীরে পৌঁছে যাওয়া একটি পরিবর্তন, যা অনুশোচনা, বিশ্বাস এবং আধ্যাত্মিক প্রশান্তির মাধ্যমে হয়।
এটি আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, ইসলামের শিক্ষা শুধুমাত্র পবিত্র কুরআন বা হাদিসের কথা নয়, বরং সেই শিক্ষা মানব জীবনের সমস্ত দিককে প্রভাবিত করার ক্ষমতা রাখে—মানবিক মূল্যবোধ, নৈতিকতা, প্রেম এবং সহিষ্ণুতা। ইসলামের সঠিক বার্তা মানুষের অন্তরে পৌঁছানোর মাধ্যমে, অনেক মানুষ তাদের জীবনে গভীর ও ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে সক্ষম হয়েছে। এটি মুসলিম এবং অমুসলিম, সৃষ্টিকর্তায় অবিশ্বাসী এবং বিশ্বাসী সকল মানুষের জন্য একটি আশার সঞ্চার।
তাহলে বলা যায়, ইসলাম একটি বিশ্বজনীন ধর্ম, যার শিক্ষা যে কোনো ব্যক্তি, যেই অবস্থাতেই থাকুক না কেন, তার অন্তরে শান্তি এবং আধ্যাত্মিক উন্নতি আনার ক্ষমতা রাখে।
উপসংহার
বাংলাদেশের নাস্তিক সমাজের ইসলামবিদ্বেষমূলক আচরণ আসলে এক ধরনের ধর্ম-বিরোধী চেতনারই বহিঃপ্রকাশ। ইসলামের সৌন্দর্য হল, ধর্মে বিশ্বাস থাকুক বা না থাকুক, মানুষের প্রতি সৌজন্যতা এবং সহিষ্ণুতা বজায় রাখা। ইসলামের মূল শিক্ষা হলো, মানুষকে সৃষ্টিকর্তার পথে নিয়ে আসা এবং তাদের অন্তরে আস্থা ও বিশ্বাস জন্মানো। বিদ্বেষ কিংবা কটাক্ষের মাধ্যমে না, বরং সংলাপের মাধ্যমে ইসলামের এই গভীরতর বোধ ও সহিষ্ণুতার বার্তা ছড়িয়ে দেয়া উচিত।
শেষ পর্যন্ত, যেসব নাস্তিক ইসলামের প্রতি বিদ্বেষ প্রদর্শন করে, তাদের প্রতি মুসলিম সমাজের দায়িত্ব হলো সৌহার্দ্য বজায় রেখে তাদের বুঝিয়ে দেয়া যে, ইসলাম তাদের প্রতি বিদ্বেষপূর্ণ আচরণ চায় না। ইসলামের মহানুভবতা এবং উদারতা তাদেরকেও আলোর পথে ফিরিয়ে আনতে সক্ষম।