ভূমিকা
কুরআন ও সুন্নাহ স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে ইসলাম হলো সত্য, ন্যায় এবং ভ্রাতৃত্বের ধর্ম। যে কোনো কাজ যা সত্যকে ক্ষুণ্ণ করে, মিথ্যা প্রচার করে বা মুসলমানদের মধ্যে আস্থা ধ্বংস করে, তা গুরুতর গুনাহ হিসেবে বিবেচিত। এর মধ্যে পরনিন্দা, গুজব ছড়ানো, অকারণ সন্দেহ করা এবং অপরকে উপহাস করা অন্তর্ভুক্ত—যা আপাতদৃষ্টিতে ছোট মনে হলেও আল্লাহর নিকট তা নিন্দিত ও মহাপাপ।
গুজব কেবল শব্দ নয়; এটি এক ধরনের অস্ত্র। এটি সম্মান নষ্ট করে, পরিবার ভেঙে দেয়, সমাজে বিভাজন সৃষ্টি করে এবং ইতিহাসে অনেক জাতিকে ধ্বংস করেছে। আজকের দ্রুতগামী তথ্যপ্রযুক্তির যুগে গুজব ও সন্দেহ মুহূর্তের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে—যা আমাদের জন্য কুরআনের সতর্কবাণীকে আরও জরুরি করে তুলেছে।
কুরআনের সতর্কবাণী: ভ্রাতৃত্ব ও মর্যাদা রক্ষা
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা সূরা হুজরাতে সরাসরি মুমিনদের উদ্দেশ্যে বলেন—
“হে ঈমানদারগণ! তোমরা এক সম্প্রদায় অপর সম্প্রদায়কে উপহাস করো না; হতে পারে উপহাসের পাত্ররা তাদের চেয়ে উত্তম। নারীরাও নারীদের উপহাস করবে না; হতে পারে তারা উত্তম। তোমরা একে অপরকে দোষারোপ করো না, এবং একে অপরকে অবমাননাকর উপাধি দিও না। ঈমান আনার পর ভাইকে গালি দেওয়া কতই না নিকৃষ্ট! আর যারা তওবা করে না, তারাই হলো জালিম।” (৪৯:১১)
এরপর আল্লাহ আরও কঠোর ভাষায় বলেন—
“হে ঈমানদারগণ! অধিক সন্দেহ থেকে বেঁচে থাকো, নিশ্চয়ই কিছু সন্দেহ গুনাহ। তোমরা গুপ্তচরবৃত্তি করো না, এবং কেউ কারও গিবত করো না। তোমাদের কেউ কি চাইবে তার মৃত ভাইয়ের গোশত খেতে? তোমরা তো একে ঘৃণা করবে। আল্লাহকে ভয় করো। নিশ্চয়ই আল্লাহ তাওবা কবুলকারী, পরম দয়ালু।” (৪৯:১২)
এখানে আল্লাহ ব্যাকবাইটিং বা গিবতের ভয়াবহতা বোঝাতে এক ভয়ংকর উপমা ব্যবহার করেছেন—মৃত ভাইয়ের মাংস খাওয়ার সাথে তুলনা করেছেন। যেমন কেউ নিজের ভাইয়ের গোশত খেতে কখনো রাজি হবে না, তেমনি কোনো মুমিনের উচিত নয় অন্য ভাইয়ের সম্মান ভক্ষণ করা।
হাদিসে গিবত ও অপবাদ
রাসূলুল্লাহ ﷺ গিবতের প্রকৃত অর্থ ব্যাখ্যা করেছেন:
*“তোমরা জানো গিবত কী?” সাহাবারা বললেন: আল্লাহ ও তাঁর রাসূলই ভালো জানেন। তখন তিনি বললেন: ‘গিবত হলো তোমার ভাই সম্পর্কে এমন কিছু বলা যা সে অপছন্দ করে।’ কেউ জিজ্ঞেস করল: যদি সেই ত্রুটি সত্যিই তার মধ্যে থাকে তাহলে? রাসূলুল্লাহ ﷺ বললেন: *‘যদি তা থাকে তবে তুমি গিবত করলে, আর যদি না থাকে তবে তুমি মিথ্যা অপবাদ (বুহতান) দিলে।’” (সহিহ মুসলিম)
অতএব—
গিবত (পরনিন্দা): অন্যের দোষ সত্য হলেও তা পেছনে বলা।
বুহতান (অপবাদ): এমন দোষ আরোপ করা যা তার মধ্যে নেই।
দুটিই বড় গুনাহ এবং সমাজে বিশ্বাস ও সৌহার্দ্য নষ্ট করে।
রাসূলুল্লাহ ﷺ আরও বলেছেন:
“যে আল্লাহ ও পরকালে ঈমান রাখে, সে যেন ভালো কথা বলে অথবা নীরব থাকে।” (বুখারি, মুসলিম)
অতএব জিহ্বাকে নিয়ন্ত্রণ করা ঈমানের অংশ।
গুজব ও সন্দেহের মনস্তত্ত্ব
মানুষ কেন গুজব ছড়ায় বা অন্যের নিন্দা করে? সাধারণত হিংসা, অহংকার বা নিজেকে বড় প্রমাণ করার প্রবণতা থেকে। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে এটি দুর্বল চরিত্রের প্রকাশ এবং তাকওয়ার অভাব।
সন্দেহ করাও হৃদয়ের এক ব্যাধি। কারও ব্যাপারে ভালো ধারণা না রেখে খারাপ ধারনা করা কুরআনের ভাষায় গুনাহ। সন্দেহ সামাজিক আস্থাকে ধ্বংস করে এবং শত্রুতার জন্ম দেয়। এজন্যই কুরআন আমাদের তাবাইয়্যুন—অর্থাৎ তথ্য যাচাইয়ের নির্দেশ দিয়েছে (৪৯:৬)।
কুমন্ত্রণার অস্ত্র: শয়তানের কৌশল
কুরআন জানিয়েছে, গোপন ফিসফিসানি ও কুমন্ত্রণা শয়তানের অস্ত্র—
“অতঃপর শয়তান তাদের কুমন্ত্রণা দিল…” (৭:২০)
“…ফিসফিসকারীর অনিষ্ট থেকে, যে মানুষের অন্তরে কুমন্ত্রণা দেয়।” (১১৪:৫-৬)
গোপন ফিসফিসানি সম্মানজনক পদ্ধতি নয়, বরং কাপুরুষতার পরিচয়। অনেক সময় রাজনৈতিক ও ধর্মীয় গোষ্ঠী এ ধরনের কুমন্ত্রণা ব্যবহার করেছে মানুষকে বিভক্ত করার জন্য। বাস্তবে তারা শয়তানের অনুসরণ করেছে, নবীর নয়।
ইতিহাস থেকে শিক্ষা: গুজবের বিভীষিকা
ইসলামের ইতিহাসে বহুবার গুজব মুসলিম সমাজে বিভেদ সৃষ্টি করেছে। অন্যতম উদাহরণ হলো হাদিসে ইফক—মুমিনদের মা আয়িশা (রা.)-এর বিরুদ্ধে মিথ্যা অপবাদ। এতে সাহাবাদের মধ্যে বিভাজন সৃষ্টি হয়েছিল, যতক্ষণ না আল্লাহ কুরআনে তাঁর পবিত্রতা ঘোষণা করেন (২৪:১১-১৬)।
পরে মুসলিম ইতিহাসে শাসক ও গোষ্ঠীগুলো প্রায়ই গুজব ও অপবাদকে ব্যবহার করেছে বিরোধীদের নির্মূল করার জন্য, যার ফলে রক্তপাত ঘটেছে ইরাক, সিরিয়া, মিশরে। আজও আফগানিস্তান, লিবিয়া, সিরিয়া প্রভৃতি দেশে একই কৌশল ব্যবহার করে মুসলিমদের মধ্যে বিভেদ ও যুদ্ধ জিইয়ে রাখা হচ্ছে।
আল্লাহ স্পষ্ট সতর্ক করেছেন—
“তোমরা তাদের মতো হয়ো না, যারা নিজেদের ধর্মকে টুকরো টুকরো করেছে এবং দলে বিভক্ত হয়েছে, প্রত্যেক দল নিজেদের নিয়ে আনন্দ করছে।” (৩০:৩১-৩২)
“যারা নিজেদের ধর্মকে বিভক্ত করে দলে দলে হয়ে গেছে, (হে মুহাম্মদ ﷺ) তোমার সাথে তাদের কোনো সম্পর্ক নেই।” (৬:১৫৯)
অতএব গুজব ছড়ানো শুধু ব্যক্তিগত পাপ নয়, বরং উম্মাহর ঐক্যের বিরুদ্ধে অপরাধ।
নবীর সহনশীলতা ও উদারতা
মুমিনদের মা আয়িশা (রা.) বলেছেন:
“রাসূলুল্লাহ ﷺ ছিলেন এক চলমান কুরআন।”
তিনি কখনো কাউকে উপহাস করেননি, গুজব ছড়াননি, বরং শত্রুকেও ক্ষমা করেছেন, তাদের জন্য হেদায়াতের দোয়া করেছেন। তাঁর এই উদার ও সহনশীল চরিত্রই আমাদের জন্য সর্বোত্তম সুন্নাহ।
মুসলমানদের করণীয়
নিজেকে ও সমাজকে গুজব ও সন্দেহের রোগ থেকে বাঁচাতে আমাদের কিছু বাস্তব পদক্ষেপ নিতে হবে— জিহ্বা নিয়ন্ত্রণ করা: শুধু সত্য ও কল্যাণকর কথা বলা।
তথ্য যাচাই করা: কোনো খবর প্রচার করার আগে নিশ্চিত হওয়া। (৪৯:৬)
সু-ধারণা করা: মুসলিম ভাই সম্পর্কে ভালো ধারনা রাখা।
গসিপ সভা এড়ানো: যেখানে মানুষকে উপহাস করা হয়, সেই আসর ত্যাগ করা।
তওবা করা: যদি কারও গিবত করা হয়ে থাকে, তবে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাওয়া এবং প্রয়োজনে তার কাছেও ক্ষমা চাওয়া।
ঐক্য প্রচার করা: বিভাজন নয়, ঐক্যকে অগ্রাধিকার দেওয়া।
আধুনিক যুগে গুজব ও সন্দেহ
বর্তমান তথ্যপ্রযুক্তির যুগে গুজব ও সন্দেহ ছড়ানোর গতি অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় বহুগুণ বেশি। আগে গুজব ছড়াতে সময় লাগত, কিন্তু এখন একটি মিথ্যা খবর সোশ্যাল মিডিয়া, হোয়াটসঅ্যাপ বা ফেসবুকের মাধ্যমে কয়েক সেকেন্ডেই হাজারো মানুষের কাছে পৌঁছে যায়।
১. সোশ্যাল মিডিয়ার অপব্যবহার
আজ আমরা দেখি, অনেকে যাচাই না করেই খবর শেয়ার করে। রাজনৈতিক বিরোধ, ধর্মীয় বিভাজন, এমনকি ব্যক্তিগত প্রতিপত্তি নষ্ট করার জন্যও ভুয়া খবর ও গুজব ছড়ানো হয়। এর ফলে মানুষের সুনাম ধ্বংস হয়, পরিবারে অশান্তি সৃষ্টি হয় এবং সমাজে ঘৃণা ও বিভক্তি ছড়ায়।
২. রাজনৈতিক প্রচারণা
মুসলিম বিশ্বের বহু দেশে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দুর্বল করার জন্য গুজব ও সন্দেহকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হয়। শত্রুপক্ষকে কাফের, মুনাফিক বা বিদআতী আখ্যা দেওয়া হয়—যা ইসলামী ভ্রাতৃত্বের সম্পূর্ণ বিপরীত। এই ধরণের গুজব অনেক সময় রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে রূপ নেয়।
৩. ধর্মীয় বিভাজন
আজকের দিনে অনেক দল নিজেদের সঠিক প্রমাণ করার জন্য অপর দলকে গুজব ও সন্দেহের মাধ্যমে আক্রমণ করে। কুরআনে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে বিভাজন সৃষ্টি করা শিরকের সমান (৩০:৩১-৩২)। তবুও বাস্তবে আমরা দেখি প্রতিটি গোষ্ঠী নিজেদের সত্য দাবি করে এবং অন্যদের মিথ্যা বলে।
৪. ব্যক্তিগত জীবনে গুজব
ব্যক্তিগত স্তরেও গুজব বিপজ্জনক। কারও চরিত্র নিয়ে মিথ্যা প্রচার, পারিবারিক দ্বন্দ্বে সন্দেহ ছড়ানো, কর্মক্ষেত্রে অপবাদ দেওয়া—এসবের মাধ্যমে সম্পর্ক নষ্ট হয় এবং মানুষ মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে।
আমাদের করণীয় আধুনিক প্রেক্ষাপটে
১. ডিজিটাল সচেতনতা: অনলাইনে কোনো তথ্য পাওয়ার পর তা যাচাই না করে শেয়ার করা যাবে না।
২. মিডিয়া জবাবদিহিতা: সংবাদমাধ্যম ও সামাজিক প্ল্যাটফর্মগুলোকে দায়িত্বশীল হতে হবে।
৩. ধর্মীয় সহিষ্ণুতা: মতভেদ থাকলেও একে অপরকে অপমান বা গুজব ছড়িয়ে আক্রমণ করা যাবে না।
৪. পারিবারিক ও সামাজিক শিক্ষা: ছোটবেলা থেকেই সন্তানদের শেখাতে হবে—গুজব ছড়ানো গুনাহ এবং এটি মানুষের সম্মান নষ্ট করে।
সমাপনী কথা
গুজব ও সন্দেহ কেবল একটি সামাজিক ব্যাধি নয়, এটি একটি আধ্যাত্মিক ব্যাধি। এটি বিশ্বাস ধ্বংস করে, উম্মাহকে বিভক্ত করে এবং আল্লাহর অসন্তুষ্টি ডেকে আনে। আধুনিক প্রযুক্তির যুগে আমাদের আরও বেশি সতর্ক হতে হবে, কারণ একটি গুজব কয়েক মুহূর্তেই হাজারো মানুষের মনে প্রভাব ফেলতে পারে।
অতএব, কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে আমাদের প্রত্যেকের দায়িত্ব—সত্য যাচাই করা, পরনিন্দা থেকে দূরে থাকা, এবং রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর মতো উদার, সহনশীল ও সত্যবাদী জীবন গড়ে তোলা। এভাবেই আমরা নিজেদের, আমাদের সমাজ এবং পুরো মুসলিম উম্মাহকে শয়তানের কুমন্ত্রণা ও বিভাজন থেকে রক্ষা করতে পারব।
গুজব ও সন্দেহ ছড়ানো ইসলামে ভয়ংকর গুনাহ। এটি ভ্রাতৃত্ব নষ্ট করে, বিভাজন সৃষ্টি করে এবং শয়তানকে খুশি করে। কুরআন গিবতের সাথে মৃত ভাইয়ের গোশত খাওয়ার উপমা দিয়েছে, আর রাসূল ﷺ সতর্ক করেছেন যে মিথ্যা অপবাদ গিবতের চেয়েও ভয়াবহ।
আমাদের উচিত এই ধ্বংসাত্মক অভ্যাস থেকে বাঁচা, জিহ্বাকে নিয়ন্ত্রণ করা এবং রাসূল ﷺ-এর উদারতা, সহনশীলতা ও সত্যবাদিতাকে অনুসরণ করা। এর মাধ্যমেই আমরা শুধু নিজেদের আত্মাকে রক্ষা করব না, বরং সমগ্র মুসলিম উম্মাহর ঐক্য ও মর্যাদাকেও সুরক্ষিত করব।