ইতিহাসের আয়নায় আজকের আমেরিকা

এইচ আর এম রোকন উদ্দিন

যুক্তরাষ্ট্র বহুদিন ধরেই শান্তির ভাষায় কথা বলে ক্ষমতার চর্চা করে এসেছে। এই দ্বৈততা নতুন নয়, তবে বর্তমানে যা ঘটছে তা একসঙ্গে বহু স্তরে, অনেক বেশি প্রকাশ্য ও অনেক বেশি নির্দয়। ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে তাঁর পররাষ্ট্রনীতির বক্তব্য—অন্তত কথার স্তরে—ছিল যুদ্ধবিরোধী, আগ্রাসনবিরোধী এবং দীর্ঘস্থায়ী ব্যয়বহুল যুদ্ধের বিরুদ্ধে। ভিয়েতনাম থেকে ইরাক ও আফগানিস্তান পর্যন্ত যে যুদ্ধগুলো আমেরিকার রক্ত ও সম্পদ নিঃশেষ করেছে, তিনি সেগুলোর কঠোর সমালোচনা করেছিলেন। শাসন পরিবর্তনের নীতিকে তিনি ব্যর্থতা হিসেবে চিহ্নিত করেছিলেন, ন্যাটোর প্রয়োজনীয়তা প্রশ্নবিদ্ধ করেছিলেন এবং “আমেরিকা ফার্স্ট”-এর নামে অন্য দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে না জড়ানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। দেশ-বিদেশে অনেকেই ভেবেছিলেন, এটি হয়তো যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত সংযমের সূচনা।

কিন্তু দ্বিতীয় দফায় ক্ষমতায় ফিরে এসে সেই চেহারা বদলে যেতে দেখা যাচ্ছে। সংযমের ভাষা ক্রমে স্থান দিচ্ছে চাপ ও বলপ্রয়োগের ভাষাকে। যে শাসন পরিবর্তনের নীতি একসময় সমালোচিত হয়েছিল, তা আবার বৈধ হাতিয়ার হিসেবে ফিরে এসেছে। ভেনেজুয়েলা, কিউবা, ইরান—এমনকি কলম্বিয়াকে ঘিরেও আলোচনা হচ্ছে কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ হিসেবে নয়, বরং রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে বদলে দেওয়ার ক্ষেত্র হিসেবে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে গ্রিনল্যান্ডকে “মালিকানাধীন” করার মতো বক্তব্য—যা উনিশ শতকের সাম্রাজ্যবাদী শব্দভাণ্ডারকে স্মরণ করিয়ে দেয়, যা আমরা ইতিহাসের কবরেই রেখে এসেছি ভেবেছিলাম।

ইতিহাস এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর যুক্তরাষ্ট্র প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সত্তরের বেশি দেশে হস্তক্ষেপ করেছে। ১৯৫৩ সালে ইরানের নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী মোসাদ্দেককে উৎখাতে সিআইএ জড়িত ছিল। ১৯৫৪ সালে গুয়াতেমালা, ১৯৭৩ সালে চিলি—এরপর নিকারাগুয়া, এল সালভাদর, গ্রেনাডা, পানামা—সব ক্ষেত্রেই যুক্তি ছিল জাতীয় নিরাপত্তা, কমিউনিজমবিরোধিতা অথবা আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা। ১৯৬১ সালের বে অব পিগস অভিযান শুধু সামরিক ব্যর্থতা ছিল না; এটি কিউবার রাজনীতিকে চিরতরে র‌্যাডিকাল করে দেয় এবং দেশটিকে সোভিয়েত বলয়ের গভীরে ঠেলে দেয়। এসব হস্তক্ষেপ স্থিতিশীলতা আনেনি; বরং এনেছে ক্ষোভ, কর্তৃত্ববাদী প্রতিক্রিয়া এবং আমেরিকার উদ্দেশ্যের প্রতি দীর্ঘস্থায়ী অবিশ্বাস।

ভেনেজুয়েলার নেতৃত্বকে জোরপূর্বক সরানোর সাম্প্রতিক ঘটনায়—নেতার চরিত্র বা শাসনব্যবস্থা যাই হোক—লাতিন আমেরিকায় সেই পুরনো ক্ষত আবার জেগে উঠেছে। অঞ্চলটির চোখে এটি গণতন্ত্র রক্ষার উদ্যোগ নয়, বরং এই সত্যের পুনঃপ্রমাণ যে ওয়াশিংটনের স্বার্থের সঙ্গে সংঘর্ষ হলে সার্বভৌমত্ব শর্তসাপেক্ষ। ১৮২৩ সালের মনরো ডকট্রিন, যা একসময় ইউরোপীয় উপনিবেশবাদ ঠেকানোর ঘোষণা ছিল, আবারও আধিপত্যের লাইসেন্স হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। ইতিহাস দেখিয়েছে, এই ব্যাখ্যা বারবার ব্যর্থ হয়েছে। বিশ শতকে লাতিন আমেরিকার অস্থিরতা কমেনি, বরং হস্তক্ষেপের কারণে দীর্ঘায়িত হয়েছে।

এই পরিস্থিতিকে আরও বিপজ্জনক করে তুলছে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ কঠোরতা। অভিবাসন নীতিতে এখন সামরিকীকরণের ছাপ স্পষ্ট। আইসিই ও বর্ডার প্যাট্রোলকে দেওয়া হয়েছে বিস্তৃত ক্ষমতা ও ব্যাপক স্বাধীনতা। ২০২৬ সালের শুরুতেই ফেডারেল অভিবাসন কর্তৃপক্ষ ও অঙ্গরাজ্য/স্থানীয় প্রশাসনের মধ্যে হাজারেরও বেশি সহযোগিতা চুক্তি কার্যকর ছিল। এটি কেবল নীতিগত পরিবর্তন নয়; এটি রাষ্ট্র ও লাখো মানুষের সম্পর্কের কাঠামোগত রূপান্তর।

এর মানবিক প্রভাব অনুমানযোগ্য। মানুষ ভয় পেয়ে গুটিয়ে যায়। অপরাধ রিপোর্ট কমে যায়। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের প্রতি আস্থা ভেঙে পড়ে। যেসব পরিবারে কেউ নাগরিক, কেউ অনিবন্ধিত—তারা স্থায়ী মানসিক চাপে বসবাস করে। এটি তাত্ত্বিক নয়। অতীতের অনুরূপ অভিযানের পর গবেষণায় দেখা গেছে, স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণ, স্কুলে উপস্থিতি এবং পুলিশের সঙ্গে সহযোগিতা—সবই কমে যায় অভিবাসীবহুল এলাকায়। রাষ্ট্র তখন শক্তিশালী মনে হলেও, সামাজিক বন্ধন নিঃশব্দে দুর্বল হয়ে পড়ে।

এর সঙ্গে রয়েছে অর্থনৈতিক বাস্তবতা। যুক্তরাষ্ট্র দ্রুত বার্ধক্যের দিকে যাচ্ছে। জন্মহার প্রতিস্থাপন মাত্রার নিচে। অভিবাসন ছাড়া অদূর ভবিষ্যতেই দেশটির জনসংখ্যা হ্রাস পেতে শুরু করবে। সরকারি পূর্বাভাস ইতোমধ্যেই শ্রমশক্তি সংকোচন, উৎপাদনশীলতা হ্রাস এবং সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার ওপর চাপের সতর্কবার্তা দিচ্ছে। কৃষি, নির্মাণ, পরিচর্যা ও সেবা খাত অভিবাসী শ্রম ছাড়া কার্যত অচল। কার্যকর বৈধ পথ ছাড়া কেবল দমননীতি কালোবাজার, শোষণ ও অর্থনৈতিক বিকৃতি সৃষ্টি করে।

আঞ্চলিকভাবে শাসন পরিবর্তনের রাজনীতি ও কঠোর অভিবাসন নীতি এক ধরনের দুষ্টচক্র তৈরি করে। বাইরের চাপ ও অস্থিতিশীলতা মানুষকে বাস্তুচ্যুত করে। বাস্তুচ্যুতি অভিবাসন বাড়ায়। অভিবাসন আবার কঠোর দমনের যুক্তি জোগায়। এতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি ক্ষোভ বাড়ে এবং মাদক নিয়ন্ত্রণ, নিরাপত্তা সহযোগিতা ও বাণিজ্যে অংশীদারিত্ব দুর্বল হয়। স্থিতিশীলতার বদলে জন্ম নেয় সন্দেহ ও জাতীয়তাবাদ।

বিশ্বপরিসরে এর প্রভাব আরও গভীর। কোনো মিত্রের ভূখণ্ড নিয়ে হুমকির ভাষা কিংবা জোরপূর্বক নেতৃত্ব অপসারণ আন্তর্জাতিক নিয়মের ভিত্তিকেই ক্ষয় করে। নিয়ম তখন বেছে বেছে প্রয়োগযোগ্য হয়ে পড়ে। যুক্তরাষ্ট্র যদি বলপ্রয়োগকে স্বাভাবিক করে তোলে, অন্য শক্তিরাও তাই করবে—নিজ নিজ অঞ্চলে। নৈতিক কর্তৃত্ব একবার হারালে, তা অস্ত্র বা নিষেধাজ্ঞা দিয়ে ফেরানো যায় না।

মিত্ররা প্রকাশ্যে বিদ্রোহ করে না, কিন্তু নীরবে বিকল্প খোঁজে। তারা বাণিজ্য, অস্ত্র, অর্থব্যবস্থা ও কূটনীতিতে বৈচিত্র্য আনে। ডলার এখনো শক্তিশালী, কিন্তু আস্থা নিঃশর্ত নয়। ন্যাটো টিকে থাকে, তবে রাজনৈতিক সংহতি ক্ষয়ে যায় যখন ছোট দেশগুলো মনে মনে ভাবে—সুরক্ষা কি একদিন চাপে রূপ নিতে পারে?

যুক্তরাষ্ট্র ভেঙে পড়বে না, কিন্তু ক্রমে কঠোর ও বিভক্ত হয়ে উঠবে—রাজনৈতিকভাবে, সামাজিকভাবে, মানসিকভাবে। আদালত ও নির্বাহী ক্ষমতার সংঘাত বাড়বে। অঙ্গরাজ্যগুলো ভিন্ন পথে হাঁটবে। অভ্যন্তরীণ জীবনে দমননীতির দৃশ্যমানতা সমাজকে আরও মেরুকৃত করবে। বাইরে শক্তি প্রদর্শন হয়তো তাত্ক্ষণিক ফল দেবে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নির্ভর করে বৈধতা ও ন্যায়বোধের ওপর।

সাম্রাজ্য সাধারণত বাইরের আঘাতে নয়, ভেতরের ভয়ের কারণে দুর্বল হয়—যখন আত্মবিশ্বাসের জায়গা নেয় সন্দেহ, মিত্র বোঝা হয়ে দাঁড়ায়, আর শক্তি প্রয়োগ হয় প্রজ্ঞার আগেই। যুক্তরাষ্ট্র আজ সেই সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। ইতিহাস বারবার দেখিয়েছে—জোর করে আনুগত্য আদায় করা যায় না, আর নেতৃত্ব মানে মালিকানা নয়। শৃঙ্খলা কখনোই অন্ধ আনুগত্য থেকে জন্ম নেয় না।


Leave a comment