প্রত্যাশা ও চ্যালেঞ্জ: তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপির ভবিষ্যৎ

ব্রিঃ জেঃ এইচ আর এম রোকন উদ্দিন(অব)

রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক অনন্য ও শ্রদ্ধেয় নাম। তিনি ছিলেন একজন সাহসী মুক্তিযোদ্ধা, দক্ষ সামরিক কর্মকর্তা এবং সংকটকালে দৃঢ় নেতৃত্বের প্রতীক। জাতি যখন রাজনৈতিক অস্থিরতা, অর্থনৈতিক দুরবস্থা ও শাসনব্যবস্থার সংকটে জর্জরিত, তখন তিনি সামনে এসে দিকনির্দেশনা দেন। ১৯৮১ সালে তাঁর নির্মম হত্যাকাণ্ড কেবল একটি জীবনই কেড়ে নেয়নি, বরং জাতির সম্ভাবনাময় এক নেতৃত্বকে অকালেই থামিয়ে দিয়েছিল। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে তিনি বহুদলীয় গণতন্ত্র প্রবর্তন করেন এবং একদলীয় শাসনের অবসান ঘটিয়ে রাজনৈতিক বহুত্ববাদ পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেন। সার্বভৌমত্ব, জাতীয়তাবাদ, সামাজিক ন্যায়বিচার ও ধর্মীয় মূল্যবোধের সমন্বয়ে তিনি রাজনীতির নতুন ধারার সূচনা করেন। তাঁর শাসনামলে বাস্তববাদী অর্থনৈতিক সংস্কার, বেসরকারি খাতের পুনরুজ্জীবন, খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধি এবং আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক পরিসরে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি উন্নয়নের প্রচেষ্টা লক্ষ্য করা যায়।

রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর এই রাজনৈতিক উত্তরাধিকার বহনের দায়িত্ব এসে পড়ে তাঁর সহধর্মিণী বেগম খালেদা জিয়ার ওপর। রাজনীতিতে অনিচ্ছাকৃত প্রবেশ সত্ত্বেও তিনি ধীরে ধীরে নিজেকে দেশের অন্যতম প্রভাবশালী নেত্রী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন। তিনবার প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করে তিনি প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক নির্বাচনী রাজনীতিকে টিকিয়ে রাখেন এবং অর্থনৈতিক অগ্রগতির কিছু পর্বে নেতৃত্ব দেন—যার মধ্যে তৈরি পোশাক শিল্পের বিস্তার ও অবকাঠামো উন্নয়ন উল্লেখযোগ্য। তাঁর নেতৃত্বে বিএনপি একটি শক্তিশালী গণভিত্তিক দলে রূপ নেয়। তবে তাঁর রাজনৈতিক জীবন ছিল নিরন্তর সংঘাতপূর্ণ। শেখ হাসিনার দীর্ঘ স্বৈরাচারী শাসনামলে তিনি কঠোর রাজনৈতিক নিপীড়ন, একের পর এক মামলার বোঝা, কারাবাস ও নানাবিধ বিধিনিষেধের শিকার হন—যা বহু পর্যবেক্ষকের মতে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। তাঁর দীর্ঘ শারীরিক অসুস্থতা ও মৃত্যু ব্যক্তি হিসেবে তাঁর ত্যাগের পাশাপাশি বাংলাদেশের চরম মেরুকৃত রাজনীতির কঠোর বাস্তবতাকেও স্মরণ করিয়ে দেয়।

এই প্রেক্ষাপটে তারেক রহমানের দেশে প্রত্যাবর্তন কেবল দলীয় ঘটনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এর তাৎপর্য জাতীয় রাজনীতিতেও গভীর। দীর্ঘদিন নির্বাসনে থাকার পর তাঁর ফেরা বিএনপির নেতা-কর্মী ও সমর্থকদের মধ্যে নতুন আশার সঞ্চার করেছে। অনেকের কাছে এটি জিয়া পরিবারের রাজনৈতিক ধারাবাহিকতার প্রতীক—বিশেষত এমন এক সময়ে, যখন বাংলাদেশ দীর্ঘদিনের কর্তৃত্ববাদী শাসনের অভিজ্ঞতা শেষে নতুন রাজনৈতিক ভারসাম্য খুঁজছে।

তারেক রহমান আজ এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। প্রত্যাশা যেমন বিপুল, তেমনি চ্যালেঞ্জও কঠিন। তিনি কেবল একটি ঐতিহাসিক দলের নেতৃত্বই নন, বরং তাঁর পিতা-মাতার দেশপ্রেম, দৃঢ়তা ও সার্বভৌমত্বকেন্দ্রিক নেতৃত্বের ভাবমূর্তি রক্ষা করার নৈতিক দায়ও বহন করছেন। বর্তমান সময়ে কেবল বক্তব্য বা আবেগ যথেষ্ট নয়। দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা বদলেছে। জুলাই বিপ্লবের পর বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে নতুন রাজনীতির স্বপ্ন জন্ম নিয়েছে—স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও দুর্নীতিমুক্ত শাসনব্যবস্থার আকাঙ্ক্ষা এখন প্রবল।

তারেক রহমানের সামনে সবচেয়ে জরুরি কাজগুলোর একটি হলো দলের অভ্যন্তরীণ সংস্কার। দীর্ঘদিনের দমন-পীড়নে দলীয় শৃঙ্খলা দুর্বল হয়েছে এবং সুযোগসন্ধানী প্রবণতা কিছু ক্ষেত্রে জায়গা করে নিয়েছে। শৃঙ্খলা, মেধা ও জবাবদিহি পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা বিএনপির জন্য অপরিহার্য—যদি দলটি আবার জনগণের আস্থা অর্জন করতে চায়। নেতৃত্বের পদে যোগ্যতা ও নিষ্ঠাকে প্রাধান্য দেওয়া, তোষণনীতি পরিহার করা এবং কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যন্ত ঐক্য ও সংহতি ফিরিয়ে আনা এখন সময়ের দাবি। দলীয় সংহতি কেবল সাংগঠনিক প্রয়োজন নয়; এটি রাষ্ট্র পরিচালনার প্রস্তুতিরও স্পষ্ট বার্তা। তৃণমূল পুনর্গঠনও সমান গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘদিন দেশের বাইরে থাকার কারণে তারেক রহমানকে সাধারণ মানুষের আরও কাছে যেতে হবে—কৃষক, শ্রমিক, ছাত্র ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের কথা শুনতে হবে। বাংলাদেশের রাজনীতিতে শক্ত তৃণমূল সংগঠনই বরাবর সফলতার চাবিকাঠি। স্থানীয় কমিটিগুলোকে সক্রিয় করা, তরুণদের অংশগ্রহণ বাড়ানো এবং মানুষের বাস্তব সমস্যার সঙ্গে যুক্ত হওয়া—এই কাজগুলোই দলীয় উদ্দীপনাকে টেকসই রাজনৈতিক শক্তিতে রূপ দিতে পারে।

সবচেয়ে সংবেদনশীল কিন্তু অনিবার্য চ্যালেঞ্জ হলো দলের ভেতর থেকে সুযোগসন্ধানী, দুর্নীতিগ্রস্ত ও অপরাধী উপাদানকে চিহ্নিত করে কার্যকরভাবে সরিয়ে দেওয়া। এটি সহজ কাজ নয়, কারণ এই গোষ্ঠীগুলো দীর্ঘদিন ধরে ক্ষমতা, অর্থ ও প্রভাবের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে এবং অনেক ক্ষেত্রে দলীয় কাঠামোর ভেতরেই শিকড় গেড়েছে। কিন্তু ভবিষ্যতে বিএনপি যদি রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পেতে চায়, তবে তার বিশ্বাসযোগ্যতা মূলত এই কঠিন সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতার ওপরই নির্ভর করবে। জনগণের ধৈর্য এখন সীমিত; তারা আর অতীতের মতো সবকিছু মেনে নিতে প্রস্তুত নয়। মানুষ বুঝে গেছে যে দুর্নীতিগ্রস্ত ও অপরাধী নেতৃত্ব দিয়ে কোনো দলই টেকসই উন্নয়ন বা ন্যায়ভিত্তিক শাসন দিতে পারে না।

আজকের জনগণ স্লোগান, আবেগী বক্তব্য বা ইতিহাসের স্মৃতিচারণে সন্তুষ্ট হয় না; তারা নেতৃত্বের চরিত্র, আচরণ ও সিদ্ধান্তে আস্থা খোঁজে। কারা সুবিধাবাদী, কারা সত্যিকারের ত্যাগী—এই পার্থক্য এখন অনেক স্পষ্ট। এ কারণে বিএনপির প্রয়োজন একটি স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ ও কঠোর অভ্যন্তরীণ জবাবদিহি ব্যবস্থা, যেখানে পরিচয় বা প্রভাব নয়, বরং নৈতিকতা ও কর্মই হবে মূল্যায়নের মানদণ্ড। এমন একটি প্রক্রিয়া চালু করা গেলে দলটি স্পষ্ট বার্তা দিতে পারবে যে তারা অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়েছে এবং নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়তে আন্তরিকভাবে

প্রস্তুত। তারেক রহমানের নেতৃত্ব বিচার হবে তাঁর পরামর্শদাতা ও সহকর্মী বাছাইয়ের মাধ্যমেও। তীব্র ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতার এই সময়ে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিএনপির জাতীয়তাবাদী দর্শন বরাবরই স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি ও বিদেশি আধিপত্যবিরোধিতার ওপর জোর দেয়। এই নীতি বাস্তবায়নে প্রয়োজন পেশাদার, দেশপ্রেমিক, সৎ ও দক্ষ উপদেষ্টা—যারা একদিকে জাতীয় স্বার্থ রক্ষা করবেন, অন্যদিকে আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক অংশীদারদের সঙ্গে বাস্তবসম্মত সম্পর্ক বজায় রাখবেন। অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার, জ্বালানি নিরাপত্তা, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান পুনর্গঠনে দক্ষতার বিকল্প নেই।

আজ বাংলাদেশ এক পরিবর্তনশীল সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। মানুষ কর্তৃত্ববাদী শাসনে ক্লান্ত, আবার পুরনো ধাঁচের দুর্নীতিগ্রস্ত রাজনীতিতেও আস্থা হারিয়েছে। এই বাস্তবতায় তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তন নতুন প্রত্যাশা তৈরি করেছে—কারণ এতে অনেকে বহুদলীয় গণতন্ত্র ও জাতীয় মর্যাদার অতীত স্মৃতির সঙ্গে সংস্কারের সম্ভাবনাকে একত্রে দেখতে পাচ্ছেন। তিনি এই প্রত্যাশাকে বাস্তবে রূপ দিতে পারবেন কি না, তা নির্ভর করবে তাঁর ব্যক্তিগত সততা, দলীয় সংস্কার এবং জনগণের সঙ্গে নতুন করে সংযোগ স্থাপনের সক্ষমতার ওপর।

ইতিহাস সত্যিই তাঁর কাঁধে এক বিশাল দায়িত্ব তুলে দিয়েছে—এটি কোনো আনুষ্ঠানিক উত্তরাধিকার নয়, বরং সময়ের কঠিন দাবি। যদি তিনি সাহসিকতার সঙ্গে দলকে বাস্তব সংস্কারের পথে এগিয়ে নিতে পারেন, তবে তা শুধু বিএনপির জন্য নয়, সমগ্র জাতির রাজনীতির জন্য একটি নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করবে। তৃণমূল পর্যায়ে আস্থা ফিরিয়ে আনা মানে কেবল সংগঠন শক্তিশালী করা নয়; এর অর্থ হলো সাধারণ মানুষের আশা, ক্ষোভ ও স্বপ্নকে সরাসরি রাজনীতির কেন্দ্রে নিয়ে আসা। এই আস্থাই একটি রাজনৈতিক আন্দোলনকে টিকিয়ে রাখে এবং তাকে ক্ষমতার জন্য নয়, পরিবর্তনের জন্য গ্রহণযোগ্য করে তোলে।

নীতিনিষ্ঠ নেতৃত্বের পথে বিএনপিকে এগিয়ে নেওয়া হবে সবচেয়ে কঠিন কিন্তু সবচেয়ে জরুরি কাজ। এটি ব্যক্তিনির্ভর রাজনীতি, গোষ্ঠীগত স্বার্থ ও সুবিধাবাদী সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে এসে প্রাতিষ্ঠানিক ও নীতিনির্ভর রাজনীতির দিকে অগ্রসর হওয়ার আহ্বান। যদি তারেক রহমান এই পরিবর্তনের নেতৃত্ব দিতে পারেন, তবে তিনি কেবল তাঁর পিতা-মাতার রাজনৈতিক উত্তরাধিকার রক্ষা করবেন না, বরং সেই উত্তরাধিকারকে সময়োপযোগী ও অর্থবহ করে তুলবেন। তখন তিনি একজন অতীতের স্মৃতির ধারক নন, বরং বর্তমানের দায়িত্বশীল নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবেন। এমন সাফল্য তাঁকে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক পুনর্জাগরণের একজন কার্যকর দিশারিতে পরিণত করতে পারে। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অবক্ষয় ও আস্থাহীনতার পর মানুষ একজন এমন নেতৃত্ব খুঁজছে, যিনি ক্ষমতার চেয়ে নীতিকে, প্রতিশোধের চেয়ে সংস্কারকে এবং বিদেশি নির্ভরতার চেয়ে জাতীয় স্বার্থকে প্রাধান্য দেবেন। যদি তিনি এই প্রত্যাশার সঙ্গে নিজেকে যুক্ত করতে পারেন, তবে তারেক রহমানের নেতৃত্ব শুধু একটি দলের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে না; এটি বাংলাদেশের উন্নয়ন, গণতন্ত্র ও সার্বভৌম ভবিষ্যতের পথরেখাও আঁকতে সক্ষম হবে।

hrmrokan@hotmail.com


Leave a comment