ভাষা নিয়ে রাজনীতির নুতন বয়ান জাতিকে বিভক্ত করবে

মেজর জেনারেল এইচ আর এম রোকন উদ্দিন(অব)

বাংলা ভাষা একটি জীবন্ত, বহমান ও গ্রহণক্ষম ভাষা। হাজার বছরের ইতিহাসে এটি নানা সংস্কৃতি, সভ্যতা ও রাজনৈতিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে গড়ে উঠেছে। পাল, সেন, সুলতানি, মুঘল, ঔপনিবেশিক এবং আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থার প্রতিটি অধ্যায় বাংলা ভাষার ভাণ্ডারকে সমৃদ্ধ করেছে। ফলে বাংলা কেবল একটি ভাষা নয়-এটি এক বহুসাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের প্রতিফলন। বাংলা ভাষার ইতিহাসই প্রমাণ করে-এটি একটি বহুস্রোত-নির্ভর, অভিযোজিত ও ক্রমবিবর্তনশীল ভাষা। ভাষাতাত্ত্বিকভাবে বাংলা ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষাপরিবারের ইন্দো-আর্য শাখার অন্তর্ভুক্ত। এর প্রাচীন উৎস মাগধী প্রাকৃত ও আপভ্রংশে, যার বিকাশধারা ৮ম–১২শ শতকে প্রাচীন বাংলা রূপে আবির্ভূত হয়। কিন্তু বাংলা কখনো একক উৎসের ভাষা ছিল না; ইতিহাসের বিভিন্ন পর্যায়ে রাজনৈতিক শাসন, বাণিজ্যিক যোগাযোগ, ধর্মীয় আদান-প্রদান ও সাংস্কৃতিক সংমিশ্রণের মাধ্যমে এর শব্দভাণ্ডার সমৃদ্ধ হয়েছে। ভাষাবিদদের গবেষণা অনুযায়ী আধুনিক বাংলা শব্দভাণ্ডারের একটি বড় অংশ সংস্কৃতমূল। বাংলা একাডেমির অভিধান ও বিভিন্ন ভাষাতাত্ত্বিক বিশ্লেষণে দেখা যায়-বাংলার মোট শব্দভাণ্ডারের প্রায় ৫০–৬০ শতাংশ শব্দ সংস্কৃত উৎসজাত (তৎসম ও তদ্ভব মিলিয়ে)। উদাহরণস্বরূপ-সমাজ, রাষ্ট্র, মানবতা, স্বাধীনতা, সংস্কৃতি, গণতন্ত্র ইত্যাদি শব্দ সংস্কৃতভিত্তিক হলেও আজ এগুলো সম্পূর্ণ বাংলা ব্যবহারের অংশ। মধ্যযুগীয় সাহিত্য-বিশেষ করে মঙ্গলকাব্য, বৈষ্ণব পদাবলি-এই সংস্কৃতভিত্তিক শব্দপ্রবাহকে শক্তিশালী করেছে।

১৩শ শতাব্দী থেকে বাংলায় মুসলিম শাসনের সূচনা হলে আরবি ও ফারসি ভাষার প্রভাব দ্রুত বৃদ্ধি পায়। সুলতানি ও মুঘল আমলে প্রশাসনিক ভাষা ছিল মূলত ফারসি। ফলে আদালত, হাকিম, কাগজ, দফতর, খবর, দরবার, দুনিয়া, আজাদ ইত্যাদি শব্দ দৈনন্দিন ব্যবহারে প্রবেশ করে। গবেষণায় দেখা যায়, বাংলা শব্দভাণ্ডারের প্রায় ১০–১৫ শতাংশ শব্দ আরবি-ফারসি উৎসজাত। ধর্মীয় পরিসরে আরবি শব্দ যেমন ইমান, সালাত, হিসাব, কিতাব ইত্যাদি ব্যবহৃত হয়েছে; আবার প্রশাসনিক ও সামাজিক পরিসরে ফারসি শব্দ ব্যাপকভাবে প্রচলিত হয়েছে। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো-বাংলার প্রাচীনতম মুসলিম কবি শাহ মুহম্মদ সগীর (১৪শ শতক) থেকে শুরু করে আলাওল (১৭শ শতক)-তাঁদের সাহিত্যকর্মে আরবি-ফারসি শব্দের সংমিশ্রণ স্পষ্ট। উর্দুর প্রভাব এসেছে প্রধানত মুঘল সামরিক ও উত্তর-ভারতীয় সাংস্কৃতিক যোগাযোগের মাধ্যমে। জিন্দাবাদ, মুর্দাবাদ, দারোগা, সিপাহী প্রভৃতি শব্দ জনআন্দোলন, প্রশাসন ও নগরজীবনের অংশ হয়ে যায়। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন ও উপমহাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে “জিন্দাবাদ” ও “ইনকিলাব” শব্দগুলো ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়, যা বাংলা ভাষায়ও স্থায়ী আসন পায়। তুর্কি উৎসের শব্দ তুলনামূলকভাবে কম হলেও ঐতিহাসিক যোগাযোগের মাধ্যমে এসেছে। টুপি, কামান, বাহাদুর প্রভৃতি শব্দ তার উদাহরণ। মধ্যযুগীয় সামরিক সংস্কৃতি ও প্রশাসনিক ব্যবস্থার মাধ্যমে এগুলো বাংলায় প্রবেশ করে।

১৮শ শতকের শেষভাগ থেকে ব্রিটিশ শাসনের ফলে ইংরেজি ভাষার প্রভাব দ্রুত বৃদ্ধি পায়। আধুনিক শিক্ষা, প্রশাসন, প্রযুক্তি ও বাণিজ্যের সঙ্গে যুক্ত অসংখ্য শব্দ-অফিস, স্কুল, কলেজ, ব্যাংক, ট্রেন, পুলিশ, আদালত (আংশিক ফারসি-ইংরেজি ব্যবহারে)-বাংলা শব্দভাণ্ডারের অংশ হয়ে যায়। ভাষাতাত্ত্বিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী আধুনিক প্রযুক্তি ও প্রশাসনিক শব্দের একটি বড় অংশই ইংরেজি উৎসজাত। আজকের নগরবাংলায় ইংরেজি উৎসের শব্দের ব্যবহার আরও বৃদ্ধি পেয়েছে। ঐতিহাসিকভাবে লক্ষ্য করলে দেখা যায়, বাংলা ভাষার বিকাশ তিনটি প্রধান ধাপে বহিরাগত প্রভাব গ্রহণ করেছে- ১. মধ্যযুগে সংস্কৃত ও ফারসি-আরবি প্রভাব,২. মুঘল-উত্তর ভারতে উর্দু-তুর্কি সংযোগ,৩. ঔপনিবেশিক যুগে ইংরেজি আধুনিকতার প্রভাব। তবে এই প্রভাব কোনো সময়েই বাংলা ভাষাকে দুর্বল করেনি; বরং শব্দভাণ্ডার ও ভাবপ্রকাশকে সমৃদ্ধ করেছে। ১৯শ শতকে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর সংস্কৃতঘেঁষা শব্দচর্চা বাড়ালেও একই সময়ে মাইকেল মধুসূদন দত্ত বা বঙ্কিমচন্দ্রের লেখায় বহুসূত্রতা লক্ষ করা যায়। আবার কাজী নজরুল ইসলামের কবিতায় আরবি-ফারসি শব্দের বিপুল ব্যবহার বাংলা কাব্যভাষায় নতুন শক্তি যোগ করে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নিজেও ভাষাকে উন্মুক্ত ধারায় ব্যবহার করেছেন। আজ বিশ্বের প্রায় ৩০ কোটিরও বেশি মানুষ বাংলা ভাষায় কথা বলেন-যা বিশ্বে সপ্তম বা অষ্টম বৃহত্তম মাতৃভাষা হিসেবে বিবেচিত। এত বিপুল ব্যবহারকারীর ভাষা কখনো স্থির থাকে না। ভাষা জীবন্ত থাকে তার গ্রহণক্ষমতার কারণে। শব্দ ধার করা ভাষার দুর্বলতা নয়; এটি ভাষার প্রাণশক্তির লক্ষণ। ইংরেজি ভাষা নিজেই ল্যাটিন, ফরাসি, গ্রিক ও জার্মান উৎস থেকে হাজার হাজার শব্দ গ্রহণ করেছে। তেমনি বাংলা ভাষাও ঐতিহাসিক বাস্তবতার আলোকে বহুভাষিক সংমিশ্রণের মাধ্যমে আজকের রূপে পৌঁছেছে।

ভাষাবিদ সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় উল্লেখ করেছেন, বাংলা ভাষা তার বহিরাগত প্রভাবকে “বাংলাকরণ” করেছে-অর্থাৎ শব্দ গ্রহণ করে ধ্বনি, রূপ ও অর্থে নিজস্ব নিয়মে মানিয়ে নিয়েছে। যেমন “হিসাব” বা “খবর” শব্দগুলো আরবি-ফারসি উৎস হলেও উচ্চারণ, বানান ও ব্যবহার সম্পূর্ণ বাংলা কাঠামোতে রূপান্তরিত হয়েছে। অতএব, সমাজ, রাষ্ট্র, আদালত, দরবার, জিন্দাবাদ, টুপি বা অফিস-এসব শব্দ আজ আর কোনো বহিরাগত পরিচয়ের চিহ্ন নয়; এগুলো বাংলা ভাষার ঐতিহাসিক যাত্রাপথের সাক্ষ্য। ভাষা কখনো দেয়াল তুলে টিকে থাকে না; ভাষা টিকে থাকে সেতুবন্ধন তৈরি করে। গ্রহণ, অভিযোজন ও রূপান্তরের মধ্য দিয়েই একটি ভাষা সমৃদ্ধ হয়। বাংলা ভাষার ইতিহাস সেই অন্তর্ভুক্তিমূলক শক্তিরই উজ্জ্বল উদাহরণ। ইনকিলাব, ইত্তেফাক, আজাদ, আজাদী, জিন্দাবাদ, মুর্দাবাদ, নারায়ে তাকবির-এসব শব্দ নতুন নয়। এগুলো উপমহাদেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক ইতিহাসের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন, ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ-সবক্ষেত্রেই নানা ভাষার শব্দ মিলেমিশে স্লোগান, কবিতা, সংবাদপত্র ও রাজনৈতিক ভাষ্য তৈরি করেছে।বাংলাদেশের সংবাদপত্রের নাম, রাজনৈতিক স্লোগান কিংবা জনআন্দোলনের ভাষায় এই শব্দগুলো বহু দশক ধরে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। কাজেই হঠাৎ করে এগুলোকে “বিদেশি” বা “অবাঞ্ছিত” আখ্যা দেওয়া ঐতিহাসিক বাস্তবতার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়।

উদ্বেগের বিষয় হলো-কোনো একটি মহল যদি ভাষার স্বাভাবিক বিবর্তনকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করে বিভাজনের বয়ান তৈরি করতে চায়, তবে তা জাতির জন্য শুভ নয়। ভাষাকে সন্দেহের চোখে দেখা শুরু হলে সমাজে অযথা বিভ্রান্তি ছড়ায়। প্রশ্ন হলো- কেন হঠাৎ করে এই বিতর্ক উত্থাপন? কার স্বার্থে ভাষাকে রাজনৈতিক ইস্যু বানানো হচ্ছে? এতে কি জনগণের প্রকৃত সমস্যা আড়াল করা হচ্ছে? ইতিহাস আমাদের শিখিয়েছে-ভাষা ও সংস্কৃতির প্রশ্নে অযথা উত্তেজনা সৃষ্টি করলে তা দ্রুত সামাজিক অস্থিরতায় রূপ নিতে পারে। সরকারের মন্ত্রী, গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব বা জননেতাদের বক্তব্য অত্যন্ত প্রভাবশালী। তাঁদের একটি শব্দও জনমনে গভীর প্রভাব ফেলতে পারে। তাই ভাষা ও সংস্কৃতি নিয়ে বক্তব্য দেওয়ার ক্ষেত্রে সংযম, ঐতিহাসিক জ্ঞান এবং দায়িত্ববোধ অপরিহার্য। যদি অসতর্ক মন্তব্যের মাধ্যমে বিভ্রান্তি ছড়ায়, তবে তা নতুন সরকারের পথচলাকে সংকটাপন্ন করতে পারে। বিরোধী শক্তি বা অস্থিতিশীলতা সৃষ্টিকারী গোষ্ঠী এই সুযোগকে কাজে লাগাতে পারে।আমরা দেখেছি-অযথা বিভাজনমূলক বক্তব্য অনেক সময় রাজনৈতিক উত্তেজনা বাড়িয়ে দিয়েছে। জাতি যখন ঐক্য ও স্থিতিশীলতার প্রয়োজন বোধ করে, তখন বিভক্তির বয়ান ক্ষতিকর। বাংলাদেশের শক্তি তার বহুত্ববাদে। আমাদের সংস্কৃতি, ভাষা, খাদ্যাভ্যাস, পোশাক-সবকিছুতেই বহুমাত্রিক প্রভাব রয়েছে। এই বৈচিত্র্যকে দুর্বলতা নয়, শক্তি হিসেবে দেখতে হবে।

সরকারের উচিত বিষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা এবং স্পষ্টভাবে জানানো- ভাষাগত বৈচিত্র্য আমাদের ঐতিহ্য, কোনো ঐতিহাসিক শব্দকে রাজনৈতিক অস্ত্র বানানো হবে না, বিভ্রান্তিকর বয়ান তৈরি করে সমাজে অস্থিরতা সৃষ্টির সুযোগ দেওয়া হবে না, জাতীয় ঐক্য রক্ষা করা আজ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।ভাষা কখনো বিভেদের কারণ নয়; বিভেদের কারণ হয় সংকীর্ণ মনোভাব ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্য। যদি আমরা অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে সংযত ও পরিমিত ভাষায় কথা বলি, তবে অযথা উত্তেজনা এড়ানো সম্ভব। বাংলা ভাষা সত্যিই বহুস্রোতের মিলনধারা। এর ভেতরে যেমন প্রাচীন ভারতীয় আর্যভাষার ঐতিহ্য আছে, তেমনি রয়েছে আরবি-ফারসি প্রভাব, তুর্কি সামরিক সংস্কৃতির ছাপ, ঔপনিবেশিক যুগের ইংরেজি আধুনিকতার অভিঘাত, এমনকি আঞ্চলিক উপভাষার প্রাণশক্তি। হাজার বছরের পথচলায় বাংলা কখনো একরৈখিক ছিল না; বরং এটি ছিল এক উন্মুক্ত নদীর মতো-যেখানে নানা উপনদী এসে মিশেছে, জল বাড়িয়েছে, স্রোতকে শক্তিশালী করেছে। এই বহুস্রোতধারাই বাংলা ভাষাকে প্রাণবন্ত করেছে। মধ্যযুগীয় কবিতায় যেমন সংস্কৃত ও আরবি-ফারসি শব্দ পাশাপাশি চলেছে, তেমনি আধুনিক সাহিত্যেও দেশীয় ও বিদেশি উৎসের শব্দ সমান স্বাভাবিকতায় ব্যবহৃত হয়েছে। ভাষা আন্দোলনের সময় আমরা “রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই” বলেছি-কিন্তু সেই বাংলা ছিল অন্তর্ভুক্তিমূলক, বহুমাত্রিক, মানুষের মুখের ভাষা। স্বাধীনতার চেতনাও এই ভাষার বৈচিত্র্যকে অস্বীকার করেনি; বরং তা ধারণ করেছে।

ভাষাকে সংকীর্ণ পরিচয়ের খাঁচায় আটকে রাখার চেষ্টা কখনো দীর্ঘস্থায়ী হয় না। কারণ ভাষা মানুষের জীবনযাপন, সংস্কৃতি, ধর্ম, বাণিজ্য, প্রযুক্তি-সবকিছুর সঙ্গে যুক্ত। মানুষ যেমন বহুমাত্রিক, ভাষাও তেমন। একটি শব্দের উৎস যতই দূরের হোক, যখন তা মানুষের দৈনন্দিন ব্যবহারে ঢুকে যায়, তখন সেটি আর “বিদেশি” থাকে না-তা হয়ে ওঠে আমাদেরই সম্পদ।এই প্রেক্ষাপটে আমাদের দায়িত্ব হলো ভাষাকে বিভাজনের হাতিয়ার না বানানো। কোনো শব্দের উৎস নিয়ে সন্দেহ তৈরি করে সমাজে অযথা দ্বন্দ্ব সৃষ্টি করা ভাষার স্বাভাবিক বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করে। ভাষা নিয়ে অহেতুক বিতর্ক জাতীয় ঐক্যকে দুর্বল করে। বরং আমাদের উচিত ভাষার বৈচিত্র্যকে শক্তি হিসেবে দেখা-কারণ বৈচিত্র্যই সৃজনশীলতার উৎস। অতএব, বাংলা ভাষার এই মিলনধারাকে রক্ষা করাই আমাদের দায়িত্ব।

লেখকঃ সাবেক সামরিক কূটনীতিক, নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক, গবেষক ও লেখক।

hrmrokan@hotmail.com


Leave a comment