মেজর জেনারেল এইচ আর এম রোকন উদ্দিন (অব)
বাংলাদেশ সেনাবাহিনী কখনোই কোনো “দুর্বল” বা “করুণ” প্রতিষ্ঠান ছিল না। এটি দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ, সুশৃঙ্খল ও গৌরবময় জাতীয় প্রতিষ্ঠান-যার জন্ম মহান মুক্তিযুদ্ধের রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম ও আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে। স্বাধীনতার পর থেকে দেশ ও জনগণের কল্যাণে কয়েক দশকের নিরবচ্ছিন্ন সেবায় প্রতিষ্ঠানটি সমৃদ্ধ হয়েছে। বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অভিযোগ কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়ানো চটকদার প্রচারণার ভিত্তিতে সেনাবাহিনীর সামগ্রিক মূল্যায়ন করা ন্যায়সংগত নয়। এর প্রাতিষ্ঠানিক ইতিহাস, পেশাগত সাফল্য, আত্মত্যাগ এবং দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও জনগণের কল্যাণে অব্যাহত অবদানের আলোকে একে বিচার করতে হবে। সেনাবাহিনীর সদস্যরা দেশের স্বাধীনতা ও ভৌগোলিক অখণ্ডতা রক্ষা, সংবিধান ও আইনের প্রতি আনুগত্য এবং প্রয়োজনে দেশের জন্য জীবন উৎসর্গ করার শপথ গ্রহণ করেন। এই অঙ্গীকার নিছক আনুষ্ঠানিকতা নয়। যুদ্ধ, পার্বত্য অঞ্চলে সন্ত্রাস দমন, দুর্যোগ মোকাবিলা, অবকাঠামো নির্মাণ, জাতীয় উন্নয়ন এবং আন্তর্জাতিক শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে তাঁরা বারবার এই অঙ্গীকারের প্রমাণ দিয়েছেন। বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, পাহাড়ধস, ভবনধস, ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড, বড় ধরনের দুর্ঘটনা কিংবা অন্য যেকোনো জাতীয় দুর্যোগে সেনাবাহিনী সাধারণ মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছে। অনেক সময় অন্য সংস্থাগুলো পূর্ণাঙ্গভাবে কাজ শুরু করার আগেই সেনাসদস্যরা দুর্গম ও দুর্যোগকবলিত এলাকায় পৌঁছে উদ্ধার, চিকিৎসা ও ত্রাণ কার্যক্রম শুরু করেছেন।
জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনেও বাংলাদেশ সেনাবাহিনী আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অর্জন করেছে। কয়েক দশক ধরে বাংলাদেশ জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে বিশ্বের অন্যতম প্রধান ইউনিফর্মধারী জনবল প্রদানকারী দেশ। আফ্রিকা, মধ্যপ্রাচ্যসহ পৃথিবীর বিভিন্ন সংঘাতপূর্ণ ও ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলে বাংলাদেশের শান্তিরক্ষীরা দায়িত্ব পালন করেছেন। সশস্ত্র গোষ্ঠীর আক্রমণ, রোগব্যাধি, প্রতিকূল আবহাওয়া এবং দুর্গম ভৌগোলিক পরিবেশের মধ্যেও তাঁরা পেশাদারিত্ব, শৃঙ্খলা, মানবিকতা ও সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছেন। জাতিসংঘের পতাকাতলে দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে অনেক বাংলাদেশি শান্তিরক্ষী জীবনও উৎসর্গ করেছেন। তাঁদের কর্মদক্ষতা বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক মর্যাদা বৃদ্ধি করেছে এবং প্রমাণ করেছে যে আমাদের সশস্ত্র বাহিনীর পেশাগত সক্ষমতা দেশের সীমানার বাইরেও স্বীকৃত। বিশ্বের কোনো বৃহৎ প্রতিষ্ঠানই ব্যক্তিগত ভুল, পেশাগত ব্যর্থতা কিংবা ক্ষমতার অপব্যবহারের ঘটনা থেকে পুরোপুরি মুক্ত নয়। সেনাবাহিনীও মানুষের সমন্বয়ে গঠিত। কাজেই বেসামরিক প্রশাসন, পুলিশ, বিচারব্যবস্থা, গণমাধ্যম, ব্যবসা বা রাজনৈতিক সংগঠনের মতো এখানেও দু-একজন বিচ্যুত বা অসৎ ব্যক্তি থাকতে পারেন। কিন্তু কোনো ব্যক্তির অপরাধ বা ভুলের দায় গোটা প্রতিষ্ঠানের ওপর চাপানো যায় না। কোনো অভিযোগ উঠলে তার নিরপেক্ষ তদন্ত, যথাযথ বিচারপ্রক্রিয়া এবং সামরিক ও রাষ্ট্রীয় আইন অনুযায়ী দোষীর শাস্তি নিশ্চিত করাই সঠিক পথ। একটি পেশাদার সেনাবাহিনীর শক্তি এই দাবিতে নয় যে সেখানে কোনো ভুল ঘটতেই পারে না; বরং তার শক্তি হলো ভুল বা অপরাধ চিহ্নিত করে দায়ী ব্যক্তিকে জবাবদিহির আওতায় আনার সক্ষমতা ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা।
সামরিক শৃঙ্খলা স্বভাবতই কঠোর। সেনাসদস্যরা সুস্পষ্ট চেইন অব কমান্ডের অধীনে দায়িত্ব পালন করেন এবং তাঁদের ওপর এমন কিছু নিয়ম, বাধ্যবাধকতা ও শাস্তির বিধান রয়েছে, যা সাধারণ নাগরিকের ক্ষেত্রে একইভাবে প্রযোজ্য নয়। তাই সেনাবাহিনীর কোনো সদস্যের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকলে তা যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে উপস্থাপন করতে হবে এবং প্রতিষ্ঠিত সামরিক, প্রশাসনিক ও বিচারিক প্রক্রিয়ায় তদন্ত করতে হবে। একই সঙ্গে অপারেশনাল নিরাপত্তার সীমাবদ্ধতা বিবেচনায় রেখে এসব প্রক্রিয়াকে যথাসম্ভব বিশ্বাসযোগ্য, কার্যকর ও স্বচ্ছ রাখতে হবে। আইনানুগ জবাবদিহি একটি প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করে; কিন্তু গুজব, গণহারে অপবাদ এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাৎক্ষণিক বিচারের সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠান ও জনবিশ্বাস-উভয়কেই ক্ষতিগ্রস্ত করে। জুলাইয়ের রাজনৈতিক অভ্যুত্থান বা গণআন্দোলনের পরবর্তী সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কিছু অংশে সেনাবাহিনীকে ঘিরে অভিযোগ, খণ্ডিত বা সম্পাদিত ভিডিও, বেনামি দাবি এবং অনুমাননির্ভর বক্তব্যের বিস্তার লক্ষ করা যাচ্ছে। কিছু প্রচারণা প্রকৃত ভুল বোঝাবুঝি, রাজনৈতিক উত্তেজনা বা তথ্যের ঘাটতি থেকে সৃষ্টি হতে পারে। আবার কিছু অপপ্রচারের উদ্দেশ্য হতে পারে জনগণ ও সেনাবাহিনীর মধ্যে সন্দেহ এবং দূরত্ব সৃষ্টি করা। প্রতিটি সমালোচনাকে ষড়যন্ত্র হিসেবে দেখা ঠিক নয়; তবে পরিকল্পিতভাবে পরিচালিত অপতথ্য ও বিভ্রান্তিমূলক প্রচারণার অস্তিত্ব সম্পর্কেও সরল থাকা চলবে না।
জাতিসংঘের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, অনিচ্ছাকৃতভাবে ছড়ানো ভুল তথ্য হলো “মিসইনফরমেশন”; আর মানুষকে প্রতারিত বা ক্ষতিগ্রস্ত করার উদ্দেশ্যে জেনেশুনে তৈরি ও প্রচার করা মিথ্যা বা বিভ্রান্তিকর তথ্য হলো “ডিসইনফরমেশন”। জাতিসংঘ সতর্ক করেছে যে এ ধরনের তথ্যযুদ্ধ মোকাবিলায় শুধু নিষেধাজ্ঞা বা প্রতিবাদ যথেষ্ট নয়; জনগণের তথ্য যাচাইয়ের সক্ষমতা, গণমাধ্যম-সচেতনতা, সামাজিক প্রতিরোধক্ষমতা এবং কর্তৃপক্ষের সময়োপযোগী ও নির্ভুল তথ্য প্রকাশ জরুরি।
আধুনিক যুদ্ধ এখন শুধু ট্যাংক, কামান, যুদ্ধবিমান কিংবা ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে পরিচালিত হয় না। বিভ্রান্তিকর বয়ান, জাল নথি, বিকৃত ছবি, কৃত্রিম অডিও-ভিডিও, উদ্দেশ্যপ্রণোদিত পরিসংখ্যান এবং সমন্বিত অনলাইন প্রচারণাও আধুনিক সংঘাতের শক্তিশালী অস্ত্র। কোনো প্রতিপক্ষ যদি জনগণের মনে সেনাবাহিনী সম্পর্কে অবিশ্বাস সৃষ্টি করতে পারে, তাহলে যুদ্ধক্ষেত্রে আক্রমণের আগেই সে একটি দেশের প্রতিরক্ষাব্যবস্থাকে মানসিক ও সামাজিকভাবে দুর্বল করে দিতে পারে। সৈনিক ও জনগণের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করা হাইব্রিড যুদ্ধের একটি পরিচিত কৌশল। জনগণ যখন প্রতিটি সামরিক পদক্ষেপকে গুজবের দৃষ্টিতে এবং প্রতিটি সেনাসদস্যকে সন্দেহের চোখে দেখতে শুরু করে, তখন জাতীয় সংহতি দুর্বল হয়ে পড়ে। শান্তির সময় এর ক্ষতি হয়তো তাৎক্ষণিকভাবে বোঝা যায় না, কিন্তু জাতীয় সংকট বা যুদ্ধের সময় এর পরিণতি ভয়াবহ হতে পারে।
আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতাও এই বিপদের গুরুত্ব প্রমাণ করে। ন্যাটো ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশ বিদেশি অপতথ্য ও তথ্যপ্রভাবকে জাতীয় নিরাপত্তার গুরুতর হুমকি হিসেবে বিবেচনা করে। কারণ পরিকল্পিত অপপ্রচার সরকারি ও প্রতিরক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রতি মানুষের আস্থা নষ্ট করে এবং সমাজকে বিভক্ত করে। ইউরোপ কাউন্সিলও বলেছে, অপতথ্য গণমাধ্যমের ওপর আস্থা দুর্বল করে এবং গণতান্ত্রিক বিতর্কের জন্য প্রয়োজনীয় নির্ভরযোগ্য তথ্যব্যবস্থাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। তবে অপতথ্য মোকাবিলার নামে যেন মানবাধিকার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, তথ্যভিত্তিক সাংবাদিকতা কিংবা আইনসংগত সমালোচনা দমন করা না হয়-তাদের নির্দেশনায় সে বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশের জন্যও এই ভারসাম্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সেনাবাহিনীকে পরিকল্পিত অপপ্রচার থেকে রক্ষা করতে হবে, কিন্তু সেই প্রয়োজনকে সত্য প্রকাশ, প্রমাণভিত্তিক প্রতিবেদন বা ন্যায়সংগত জবাবদিহির দাবি বন্ধ করার অজুহাত বানানো উচিত নয়।
প্রতিরক্ষা নীতি, সামরিক বাজেট, বাহিনীর কর্মদক্ষতা এবং জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয় নিয়ে প্রশ্ন তোলার অধিকার নাগরিকদের অবশ্যই রয়েছে। গঠনমূলক সমালোচনা একটি প্রতিষ্ঠানকে সংশোধিত, আধুনিক ও আরও দক্ষ হতে সাহায্য করে। কিন্তু সমালোচনা ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অপপ্রচার এক বিষয় নয়। গঠনমূলক সমালোচনা যাচাইযোগ্য তথ্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত হয়, দায়িত্বশীল ভাষা ব্যবহার করে, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে উত্তর দেওয়ার সুযোগ দেয় এবং সমস্যার সমাধান বা প্রতিষ্ঠানের উন্নতি কামনা করে। বিপরীতে, অপপ্রচার পূর্বনির্ধারিত সিদ্ধান্ত দিয়ে শুরু হয়, বেনামি বা জাল তথ্যের ওপর নির্ভর করে, ঘটনাকে প্রেক্ষাপট থেকে বিচ্ছিন্ন করে এবং গোটা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ঘৃণা ও ক্ষোভ সৃষ্টি করতে চায়। একটি গণতান্ত্রিক জবাবদিহি শক্তিশালী করে; অন্যটি সামরিক-বেসামরিক সম্পর্ককে বিষাক্ত করে তোলে। সামরিক বিষয়ের সংবেদনশীলতার অর্থ এই নয় যে সবকিছুই চিরকাল জনগণের কাছ থেকে গোপন রাখতে হবে। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সশস্ত্র বাহিনীর ওপর নির্বাচিত বেসামরিক সরকারের নিয়ন্ত্রণ, সংসদীয় পর্যবেক্ষণ, আর্থিক জবাবদিহি এবং অভিযোগ তদন্তের আইনসংগত ব্যবস্থা থাকে। কিন্তু কোনো দায়িত্বশীল রাষ্ট্রই তার সামরিক অভিযানের পরিকল্পনা, গোয়েন্দা মূল্যায়ন, সেনা মোতায়েন, নিরাপত্তা দুর্বলতা, সদস্যদের ব্যক্তিগত তথ্য অথবা সংবেদনশীল কমান্ড-সংক্রান্ত বিষয় জনসমক্ষে বিনোদনের উপকরণ হিসেবে তুলে ধরে না। আপাতদৃষ্টিতে নিরীহ তথ্যও বিভিন্ন উৎসের সঙ্গে মিলিয়ে বিশ্লেষণ করলে প্রতিপক্ষ কোনো বাহিনীর সক্ষমতা, দুর্বলতা, অবস্থান ও কর্মকৌশল সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ ধারণা লাভ করতে পারে। এ কারণেই পৃথিবীর সব পেশাদার সামরিক বাহিনীতে অপারেশনাল নিরাপত্তার নীতি অনুসরণ করা হয়।
সরকারকে সংবিধান, আইন এবং উপযুক্ত কমান্ড চ্যানেলের মাধ্যমে সশস্ত্র বাহিনীর কল্যাণ, প্রস্তুতি, আধুনিকায়ন ও মনোবল নিশ্চিত করতে হবে। সেনাসদস্য ও তাঁদের পরিবার উপযুক্ত আবাসন, চিকিৎসা, প্রশিক্ষণ, আধুনিক সরঞ্জাম, ন্যায্য ক্যারিয়ার ব্যবস্থাপনা এবং অবসর-পরবর্তী সহায়তা পাওয়ার অধিকারী। তাঁদের কোনো যৌক্তিক অভিযোগ থাকলে তা দ্রুত ও ন্যায্যভাবে সমাধান করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে সেনা কর্তৃপক্ষকেও বুঝতে হবে যে জনবিশ্বাস রক্ষার জন্য সময়োপযোগী ও তথ্যসমৃদ্ধ যোগাযোগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কোনো মিথ্যা প্রচারণা জনমনে গুরুতর বিভ্রান্তি সৃষ্টি করলে যথাসময়ে সত্য তথ্য প্রকাশ করা উচিত। অপারেশনাল কারণে কিছু ক্ষেত্রে নীরবতা অপরিহার্য হতে পারে; কিন্তু অপ্রয়োজনীয় নীরবতা তথ্যের শূন্যতা সৃষ্টি করে, আর সেই শূন্যস্থান খুব দ্রুত গুজব ও অপপ্রচার দখল করে নেয়। ইউটিউবার, অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ভাষ্যকারদের বুঝতে হবে-সামরিক ও জাতীয় নিরাপত্তার বিষয় ভিউ, অনুসারী কিংবা বিজ্ঞাপনী আয় বাড়ানোর সাধারণ উপকরণ নয়। কোনো চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রচারের আগে প্রত্যেক দায়িত্বশীল নাগরিকের প্রশ্ন করা উচিত: তথ্যটির মূল উৎস কে? প্রমাণটি সত্য ও অক্ষত কি না? সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য নেওয়া হয়েছে কি না? তথ্য প্রকাশের ফলে কোনো সেনাসদস্য, স্থাপনা বা অভিযান ঝুঁকির মুখে পড়বে কি না? বিষয়টি জনগণকে সত্যিই অবহিত করছে, নাকি শুধু উত্তেজনা ও বিদ্বেষ ছড়াচ্ছে? একটি পোস্ট পরে মুছে ফেলা সম্ভব, কিন্তু সেটির মাধ্যমে সৃষ্টি হওয়া অবিশ্বাস ও নিরাপত্তাজনিত ক্ষতি বহু বছর স্থায়ী হতে পারে।
সেনাবাহিনী কোনো সরকার বা রাজনৈতিক দলের সম্পত্তি নয়। এটি প্রজাতন্ত্র ও জনগণের প্রতিষ্ঠান। তাই সেনাবাহিনীকে পেশাদার, রাজনৈতিকভাবে নিরপেক্ষ, সংবিধানের প্রতি অনুগত এবং আইনের কাছে জবাবদিহিমূলক থাকতে হবে। অন্যদিকে নাগরিকদেরও একে দলীয় বিরোধের লক্ষ্যবস্তু বানানো কিংবা কয়েকজন ব্যক্তির কথিত আচরণের ভিত্তিতে হাজার হাজার নিবেদিতপ্রাণ সদস্যকে বিচার করা উচিত নয়। সশস্ত্র বাহিনীর প্রতি ভালোবাসা ও সম্মান প্রদর্শনের অর্থ তাদের প্রতিটি কাজকে প্রশ্নহীনভাবে সমর্থন করা নয়; বরং এর অর্থ হলো ন্যায়সংগত, দায়িত্বশীল ও তথ্যভিত্তিক দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করা এবং জাতীয় জীবনে তাদের অপরিহার্য ভূমিকা উপলব্ধি করা। বাংলাদেশের প্রতিপক্ষরা এমন একটি সেনাবাহিনী দেখতে চাইবে, যা তার জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন এবং এমন একটি জনগোষ্ঠী চাইবে, যারা দেশের প্রতিরক্ষাকারীদের বিশ্বাস করে না। গুজব, রাজনৈতিক অপব্যবহার কিংবা দায়িত্বহীন অনলাইন তৎপরতার মাধ্যমে সেই দূরত্ব সৃষ্টি হতে দেওয়া যাবে না। জাল গল্পের পরিবর্তে যাচাই করা তথ্য, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের তাৎক্ষণিক বিচারের পরিবর্তে আইনানুগ জবাবদিহি এবং প্রাতিষ্ঠানিক অপবাদের পরিবর্তে গঠনমূলক সমালোচনাকে প্রাধান্য দিতে হবে। জনগণ ও সশস্ত্র বাহিনীর মধ্যকার আস্থা ও সংহতি আমাদের জাতীয় নিরাপত্তার এক অমূল্য সম্পদ। এই সম্পর্ক রক্ষার দায়িত্ব শুধু সেনাবাহিনীর নয়; সরকার, রাজনৈতিক নেতৃত্ব, গণমাধ্যম, নাগরিক সমাজ এবং প্রতিটি সচেতন ও দেশপ্রেমিক নাগরিকেরও সমান দায়িত্ব।
hrmrokan@hotmail.com