মেঃ জেঃ এইচ আর এম রোকন উদ্দিন (অব)
২০১৫ সালের জুন মাসে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ঢাকায় সফরকালে বাংলাদেশে একটি ভারত-নির্দিষ্ট অর্থনৈতিক অঞ্চল (Indian Economic Zone – IEZ) প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব উত্থাপন করেন। এটি দ্বিপাক্ষিক অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও বিনিয়োগ বৃদ্ধির উদ্যোগ হিসেবে উপস্থাপিত হয়। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রস্তাবটিতে নীতিগত সম্মতি দেন এবং একটি যৌথ ঘোষণার মাধ্যমে বিষয়টি আনুষ্ঠানিক রূপ পায়। প্রাথমিক পর্যায়ে বাংলাদেশ তুলনামূলকভাবে সতর্ক অবস্থান গ্রহণ করেছিল। মংলা বা রামপাল এলাকায় ১০০ থেকে ৩০০ একর জমি দেওয়ার প্রস্তাব ওঠে—যেগুলো অর্থনৈতিকভাবে সম্ভাবনাময় হলেও জাতীয় নিরাপত্তার দিক থেকে তুলনামূলক কম সংবেদনশীল। কিন্তু ২০১৭ সালে, শেখ হাসিনার বহুল আলোচিত নয়াদিল্লি সফরের সময় পরিকল্পনাটির পরিসর ও অবস্থান নাটকীয়ভাবে বদলে যায়। চট্টগ্রামের মীরসরাই এলাকায় এক হাজার একরের বেশি, পরে প্রায় ৯০০ একর জমি বরাদ্দের পরিকল্পনা সামনে আসে, যেখানে উন্নয়নে ভারতের আদানি গ্রুপ যুক্ত থাকার কথা শোনা যায়।
আইনি দৃষ্টিকোণ থেকে একটি বিষয় স্পষ্ট করা জরুরি। বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (BEZA)–এর কাঠামো অনুযায়ী অর্থনৈতিক অঞ্চলের জমি বিক্রি নয়, লিজ দেওয়া হয়—সাধারণত ৫০ বছরের জন্য, নবায়নের সুযোগসহ। অর্থাৎ কাগজে–কলমে জমির সার্বভৌম মালিকানা রাষ্ট্রের হাতেই থাকে। কিন্তু ইতিহাস আমাদের শেখায়—সার্বভৌমত্ব শুধু দলিলে নয়; কার্যকর নিয়ন্ত্রণ, প্রভাব ও স্বাধীন সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতার ওপর নির্ভর করে। বাংলাদেশ সরকার পরবর্তীতে জানায় যে মীরসরাইয়ে ভারতীয় অর্থনৈতিক অঞ্চলের জন্য ৯০০ একর জমি লিজ দেওয়ার সিদ্ধান্ত কাগজে–কলমে বাতিল করা হয়েছে এবং সেখানে একটি প্রতিরক্ষা শিল্পাঞ্চল গড়ে তোলার চিন্তা করা হচ্ছে। বিদেশি কোনো শক্তিকে এমন কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ স্থানে বৃহৎ অর্থনৈতিক উপস্থিতি দেওয়া থেকে সরে আসা নীতিগতভাবে একটি বাস্তববাদী ও ইতিবাচক সিদ্ধান্ত। তবে গভীর নিরাপত্তা মূল্যায়ন ছাড়া এক ঝুঁকিপূর্ণ পরিকল্পনার জায়গায় আরেকটি ঝুঁকিপূর্ণ পরিকল্পনা বসানো হলে সমস্যার প্রকৃতি বদলালেও ঝুঁকি থেকেই যায়।
মীরসরাই কোনো সাধারণ শিল্প এলাকা নয়। এটি দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম সংবেদনশীল কৌশলগত ভূখণ্ড—ফেনী ‘চিকেন নেক’বা করিডর–এর নিকটবর্তী। এই সংকীর্ণ ভূখণ্ড ভারতের মূল ভূখণ্ডকে উত্তর–পূর্বাঞ্চলের সঙ্গে যুক্ত করে এবং দীর্ঘদিন ধরেই ভারতীয় সামরিক পরিকল্পনায় এটি একটি বড় দুর্বলতা হিসেবে বিবেচিত। স্বাভাবিকভাবেই, এই অঞ্চলটি বাংলাদেশের জন্যও একটি কৌশলগত চাপবিন্দু(Pressure Point)। ইতিহাসে দেখা যায়—সংকীর্ণ করিডর ও সীমান্তসংলগ্ন অঞ্চলগুলো সংকটকালে প্রায়ই সামরিক টানাপোড়েনের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়। সিলিগুড়ি করিডর থেকে শুরু করে ইউরোপের ঠান্ডা যুদ্ধকালীন চোকপয়েন্টগুলো—সব ক্ষেত্রেই ভূগোলই কৌশল নির্ধারণ করেছে। দক্ষিণ এশিয়ায় ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ স্পষ্টভাবে দেখিয়েছে, সীমান্ত, প্রবেশপথ ও ভূখণ্ডের গভীরতা কীভাবে যুদ্ধের গতিপথ নির্ধারণ করে। সামরিক দৃষ্টিকোণ থেকে আন্তর্জাতিক সীমান্তের এত কাছে একটি প্রতিরক্ষা শিল্পাঞ্চল স্থাপন করা কৌশলগতভাবে দুর্বল সিদ্ধান্ত। প্রতিরক্ষা শিল্পের জন্য প্রয়োজন— ভৌগোলিক গভীরতা ও বিস্তার, নিরাপদ সরবরাহ ও লজিস্টিক ব্যবস্থা, নজরদারি, নাশকতা বা আগাম আঘাত থেকে সুরক্ষা, সীমান্তসংলগ্ন এলাকায় এসব শর্ত পূরণ করা কঠিন। কোনো সংঘাত বা উত্তেজনার সময় এ ধরনের স্থাপনা হবে প্রথম নজরদারি ও প্রথম ঝুঁকির লক্ষ্যবস্তু।
এখানেই সশস্ত্র বাহিনীর সমন্বয় প্রশ্নটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। মীরসরাইয়ের মতো সংবেদনশীল স্থানের বিষয়ে সিদ্ধান্ত কেবল বেসামরিক প্রশাসন বা একক বাহিনীর দৃষ্টিভঙ্গির ওপর ছেড়ে দিলে চলবে না। আধুনিক জাতীয় নিরাপত্তা ধারণা মূলত যৌথ (joint)। মীরসরাইয়ে কার্যকর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে স্থল, নৌ ও আকাশ—এই তিন বাহিনীর সমন্বিত পরিকল্পনা ও মোতায়েন অপরিহার্য। স্থলবাহিনী ভূমি নিয়ন্ত্রণ ও দ্রুত প্রতিক্রিয়া নিশ্চিত করে। নৌবাহিনী উপকূলীয় ও সামুদ্রিক নজরদারি জোরদার করে। বিমানবাহিনী আকাশসীমা পর্যবেক্ষণ ও আগাম সতর্কতা প্রদান করে।যেখানে বাহিনীগুলো বিচ্ছিন্নভাবে কাজ করে, সেখানে গোয়েন্দা ফাঁক ও বিলম্ব তৈরি হয়। আর যেখানে সমন্বিত পরিকল্পনা ও কমান্ড কাঠামো থাকে, সেখানে প্রতিরোধ ক্ষমতা ও স্থিতিশীলতা বহুগুণ বাড়ে। আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো—কৌশলগত অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তের শুরুতেই সশস্ত্র বাহিনীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা। জমি বরাদ্দের পর নিরাপত্তা মূল্যায়ন নয়; বরং নিরাপত্তা মূল্যায়নের ভিত্তিতেই জমি বরাদ্দ হওয়া উচিত।
সামরিক স্থাপনা ও প্রতিরক্ষা শিল্পের মধ্যে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও মৌলিক পার্থক্য রয়েছে—এই পার্থক্য উপেক্ষা করলে কৌশলগতভাবে গুরুতর ভুল সিদ্ধান্ত নেওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। সামরিক স্থাপনাগুলো মূলত অপারেশনাল চরিত্রের। এগুলোর উদ্দেশ্য হলো ভূখণ্ড ধরে রাখা, সম্ভাব্য প্রতিপক্ষকে নিরুৎসাহিত করা এবং আগাম সতর্কতা নিশ্চিত করা। এসব কাজের জন্য যে উপাদানগুলো সবচেয়ে জরুরি—তা হলো উপস্থিতি, দ্রুত প্রতিক্রিয়ার সক্ষমতা এবং পরিস্থিতি সম্পর্কে অবিচ্ছিন্ন ধারণা। এ কারণেই সীমান্তসংলগ্ন, উপকূলবর্তী বা কৌশলগত করিডরের নিকটবর্তী সংবেদনশীল এলাকাগুলোতে সামরিক স্থাপনা স্থাপন করা যুক্তিসংগত ও কার্যকর। মীরসরাইয়ের মতো স্থানে সামরিক উপস্থিতি শত্রুপক্ষের পরিকল্পনাকে জটিল করে তোলে এবং রাষ্ট্রের প্রতিরোধ ক্ষমতাকে দৃশ্যমান ও বিশ্বাসযোগ্য করে। প্রতিরক্ষা শিল্পের চরিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। প্রতিরক্ষা শিল্প যুদ্ধ করার জন্য নয়; বরং যুদ্ধ পরিচালনার সক্ষমতা দীর্ঘমেয়াদে ধরে রাখার জন্য গড়ে তোলা হয়। এখানে গবেষণা ও উন্নয়ন, উৎপাদন, সংরক্ষণ, প্রযুক্তিগত জ্ঞান এবং জটিল সরবরাহ শৃঙ্খল জড়িত থাকে। এসব শিল্পের প্রধান শক্তি নিহিত থাকে নিরবচ্ছিন্নতা, নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতায়। সামান্য বিঘ্ন এমনকি নজরদারি, নাশকতা বা সাইবার আক্রমণের আশঙ্কা—দীর্ঘমেয়াদি প্রতিরক্ষা প্রস্তুতিকে দুর্বল করে দিতে পারে। এই কারণেই ইতিহাস ও সামরিক নীতিতে প্রতিরক্ষা শিল্প সবসময় নিরাপদ ও গভীর ভূখণ্ডে, সম্ভাব্য সংঘাত অঞ্চল থেকে দূরে স্থাপনের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
জাতীয় স্বার্থের দৃষ্টিকোণ থেকে মীরসরাইয়ের ক্ষেত্রে এই পার্থক্যটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। মীরসরাইয়ের প্রকৃত মূল্য তার ভৌগোলিক অবস্থানে, শিল্প সক্ষমতায় নয়। এটি এমন একটি এলাকা যেখানে সামরিক নজরদারি, কমান্ড ও কন্ট্রোল ব্যবস্থা এবং দ্রুত মোতায়েনযোগ্য বাহিনীর উপস্থিতি রাষ্ট্রকে কৌশলগত সুবিধা দেয়। এখানে নির্বাচিত সামরিক স্থাপনা গড়ে তোলা হলে তা সার্বভৌমত্ব রক্ষায় সহায়ক হবে এবং যে কোনো সম্ভাব্য আগ্রাসী বা চাপ সৃষ্টিকারী শক্তির জন্য ঝুঁকি ও অনিশ্চয়তা বাড়িয়ে তুলবে। এর বিপরীতে, মীরসরাইয়ে প্রতিরক্ষা শিল্প স্থাপন করলে নিরাপত্তা জোরদার হওয়ার বদলে কৌশলগত ভঙ্গুরতা তৈরি হবে। সীমান্ত বা সংবেদনশীল অঞ্চলের নিকট স্থায়ী শিল্প অবকাঠামো সহজেই নজরদারির আওতায় পড়ে এবং সংঘাত না থাকলেও রাজনৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক চাপ তৈরির হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে। কোনো উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতিতে এসব স্থাপনা হবে প্রথম সারির ঝুঁকিপূর্ণ লক্ষ্য—যা প্রতিরক্ষা শিল্পের মূল দর্শনের সম্পূর্ণ পরিপন্থী।
অন্যদিকে ফৌজদারহাট, ভাঠিয়ারী বা চট্টগ্রামের অন্যান্য অংশ প্রতিরক্ষা শিল্প গড়ে তোলার জন্য অনেক বেশি উপযোগী। এসব এলাকায় আগে থেকেই নৌঘাঁটি, শিল্প অবকাঠামো, বন্দর সুবিধা এবং গভীর লজিস্টিক সাপোর্ট বিদ্যমান। এখানে প্রতিরক্ষা শিল্প স্থাপন করলে সংবেদনশীল প্রযুক্তি সুরক্ষিত থাকবে, উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা কমবে এবং সামগ্রিক প্রতিরক্ষা সক্ষমতা আরও সংহত হবে। শেষ পর্যন্ত কৌশলগত বিচক্ষণতার মূল কথা হলো—কার্যকারিতা ও ভূগোলের মধ্যে সঠিক মিল ঘটানো। মীরসরাই হওয়া উচিত এমন একটি এলাকা, যাকে ধরে রাখা ও সুরক্ষিত করা হবে; সেখানে দীর্ঘমেয়াদি ও ঝুঁকিপূর্ণ শিল্প সম্পদ কেন্দ্রীভূত করা হবে না। সামরিক স্থাপনা সেখানে প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ জোরদার করবে, আর প্রতিরক্ষা শিল্প নিরাপদ অঞ্চলে গড়ে উঠলে জাতীয় নিরাপত্তা হবে আরও স্থিতিশীল ও টেকসই।
মীরসরাইয়ের প্রকৃত মূল্য শিল্প উৎপাদনে নয়; এর মূল্য কৌশলগত নিয়ন্ত্রণ ও জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চয়তায়। সেখানে বিদেশি অর্থনৈতিক উপস্থিতি ঝুঁকিপূর্ণ ছিল। যথাযথ পুনর্মূল্যায়ন ছাড়া সেখানে প্রতিরক্ষা শিল্প বসানোও ভিন্ন রূপে একই ঝুঁকি বহন করতে পারে। জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় প্রয়োজন দূরদৃষ্টি, সংযম ও সমন্বয়। সমন্বিত সশস্ত্র বাহিনী পরিকল্পনা, কৌশলগত ভূখণ্ডে সামরিক নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা, এবং প্রতিরক্ষা শিল্পকে নিরাপদ ও গভীর এলাকায় স্থানান্তর—এই পথেই বাংলাদেশ তার সার্বভৌমত্ব, স্থিতিশীলতা ও কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন রক্ষা করতে পারে। ইতিহাস তাদের ক্ষমা করে না, যারা ভূগোল ও নিরাপত্তার বাস্তবতা উপেক্ষা করে। মীরসরাইকে দেখতে হবে কোনো সাধারণ শিল্প প্লট হিসেবে নয়, বরং একটি কৌশলগত সম্পদ হিসেবে—যা রক্ষা, নিয়ন্ত্রণ ও ব্যবস্থাপনার সর্বোচ্চ জাতীয় দায়িত্ব দাবি করে।ঐ অঞ্চলে যথাযথ সামরিক স্থাপনা ও উপস্থিতির মাধ্যমে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা বিধান করা দরকার।
লেখকঃ অবসরপ্রাপ্ত সামরিক কূটনীতিক, ভু- রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক, লেখক ও গবেষক। hrmrokan@hotmail.com