মিয়ানমারের সংকট ও বাংলাদেশের নিরাপত্তা বাস্তবতা

মেজর জেনারেল এইচ আর এম রোকন উদ্দিন (অব)

২০২৬ সালের জানুয়ারির শেষে ঘোষিত নির্বাচনের চূড়ান্ত ফলাফল মিয়ানমারের দীর্ঘস্থায়ী সংকটের কোনো সমাধান এনে দেয়নি; বরং রাজনৈতিক বাস্তবতাকে আরও স্পষ্ট করে দিয়েছে। সামরিক জান্তা সমর্থিত দল কাঠামোগত সুবিধা, সীমিত প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে ভোটগ্রহণ স্থগিত থাকার বাস্তবতায় প্রত্যাশিতভাবেই সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে। কিন্তু এই ফলাফল আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক স্বীকৃতি পায়নি। আঞ্চলিক জোট আসিয়ান আগেই পর্যবেক্ষক না পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছিল; নির্বাচনের পরও তারা ফলাফলের পূর্ণ বৈধতা দেয়নি। ফলে জান্তার প্রত্যাশিত “রাজনৈতিক এক্সিট র‍্যাম্প” আংশিকভাবে নির্মিত হলেও তা আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতার সেতু হয়ে উঠতে পারেনি। মাঠের বাস্তবতায় খুব বেশি পরিবর্তন আসেনি। ২০২১ সালের অভ্যুত্থানের পর যে বহুমুখী সংঘাত শুরু হয়েছিল, তা এখন আরও জটিল রূপ নিয়েছে। দেশের মানচিত্র কার্যত খণ্ডিত—কোথাও সামরিক বাহিনীর সরাসরি নিয়ন্ত্রণ, কোথাও জাতিগত সশস্ত্র গোষ্ঠীর আধিপত্য, আবার কোথাও ন্যাশনাল ইউনিটি গভর্নমেন্ট (NUG)–ঘনিষ্ঠ পিপলস ডিফেন্স ফোর্স (PDF)–এর প্রভাব। নির্বাচনের ফলাফল এই বাস্তবতাকে বদলাতে পারেনি। বরং বহু সংঘাতপূর্ণ এলাকায় ভোটগ্রহণই সম্ভব হয়নি, যা পুরো প্রক্রিয়ার অন্তর্ভুক্তিমূলক চরিত্রকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।

জান্তার সামরিক কৌশল মোটামুটি অপরিবর্তিত রয়েছে। বিমান হামলা, ভারী গোলাবর্ষণ এবং শাস্তিমূলক অভিযান চালিয়ে তারা গুরুত্বপূর্ণ শহর, যোগাযোগ করিডর ও সামরিক স্থাপনা ধরে রাখার চেষ্টা করছে। যেখানে সরাসরি উপস্থিতি টেকসই নয়, সেখানে স্থানীয় মিলিশিয়া ও প্রক্সি বাহিনীর ওপর নির্ভর করছে। একই সঙ্গে বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে বিভাজন তৈরি বা কাজে লাগানোর কৌশল অব্যাহত রয়েছে। কিন্তু সমস্যা হলো—এটি এমন একটি যুদ্ধক্ষেত্র, যেখানে নিয়ন্ত্রণের মানচিত্র দ্রুত বদলে যায়। শত্রুভাবাপন্ন এলাকায় দীর্ঘস্থায়ী উপস্থিতি বজায় রাখার খরচ জান্তার জনবল, সরঞ্জাম ও রাজনৈতিক পুঁজি—সবকিছুর ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। উত্তর শান প্রদেশে চীনের ভূমিকা আরও দৃশ্যমান হয়েছে। সীমান্ত নিরাপত্তা ও বাণিজ্যপথ বিঘ্নিত হলে বেইজিং সরাসরি মধ্যস্থতায় নামে। এমএনডিএএ (Myanmar National Democratic Alliance Army)–এর সঙ্গে যুদ্ধবিরতি এবং তা পর্যবেক্ষণে চীনা প্রতিনিধিদল পাঠানোর ঘটনা দেখিয়েছে—সীমান্তঘেঁষা অঞ্চলে চীন চাইলে সামরিক বাস্তবতাকেও প্রভাবিত করতে পারে। থ্রি ব্রাদারহুড অ্যালায়েন্সের কিছু অংশের পিছু হটা বা সমঝোতার পেছনেও চীনা চাপ ও প্রণোদনার ভূমিকা ছিল বলে বিশ্লেষকদের ধারণা। এর ফলে উত্তরে সাময়িক চাপ কমলেও, মিয়ানমারের সার্বিক সংঘাতের কাঠামো অক্ষুণ্ণ রয়েছে। চীনের লক্ষ্য স্পষ্ট—স্থিতিশীল সীমান্ত, নিরাপদ অর্থনৈতিক করিডর এবং নিজস্ব কৌশলগত স্বার্থ সুরক্ষা।

পশ্চিমাঞ্চলে, বিশেষ করে রাখাইন রাজ্যে, পরিস্থিতি ভিন্ন গতিপথ নিয়েছে। Arakan Army গত কয়েক বছরে একটি শক্তিশালী বিদ্রোহী বাহিনী থেকে কার্যত ডি-ফ্যাক্টো প্রশাসনিক শক্তিতে পরিণত হয়েছে। ২০২৪–২০২৫ সালের ধারাবাহিক অভিযানে তারা বহু সামরিক ঘাঁটি ও যোগাযোগ অবকাঠামো দখল বা অচল করেছে। নির্বাচনের পরও রাখাইনের বড় অংশে জান্তার নিয়ন্ত্রণ সীমিত। আরাকান আর্মি অনেক এলাকায় রাজস্ব আদায়, নিরাপত্তা নিয়ন্ত্রণ ও স্থানীয় প্রশাসন পরিচালনা করছে। রাখাইন কেবল একটি প্রদেশ নয়; এটি বঙ্গোপসাগরের প্রবেশদ্বার, জ্বালানি ও পরিবহন প্রকল্পের করিডর এবং বাংলাদেশ সীমান্তসংলগ্ন এলাকা। ফলে এখানকার সংঘাত আঞ্চলিক মাত্রা পেয়েছে। মিয়ানমারের প্রতিরোধ আন্দোলনও একরৈখিক নয়। NUG–সমর্থিত PDF বিভিন্ন অঞ্চলে সক্রিয়, কখনো জাতিগত সশস্ত্র গোষ্ঠীর সঙ্গে সমন্বয়ে, কখনো প্রতিদ্বন্দ্বিতায়। বহু ছোট জাতিগত সংগঠন সীমান্ত ও স্থানীয় অর্থনীতিনির্ভর এলাকায় নিজেদের প্রভাব ধরে রেখেছে। জোটগুলো কৌশলগত; আদর্শগত ঐক্য সবসময় দৃঢ় নয়। এই বাস্তবতায় নির্বাচন একটি রাজনৈতিক কাঠামো তৈরি করলেও তা দেশের ক্ষমতার বাস্তব বণ্টনকে প্রতিফলিত করে না। ২০০৮ সালের সংবিধান অনুযায়ী সংসদের ২৫ শতাংশ আসন সামরিক বাহিনীর জন্য সংরক্ষিত—ফলে নির্বাচনের ফল যাই হোক, সামরিক প্রভাব কাঠামোগতভাবে বহাল থাকে। চূড়ান্ত ফলাফল তাই ক্ষমতার পুনর্বিন্যাসের বদলে বিদ্যমান ব্যবস্থার পুনঃপ্রতিষ্ঠা হিসেবেই প্রতীয়মান হয়েছে।

আন্তর্জাতিক শক্তিগুলোর অবস্থানও ভিন্নমুখী। চীন সীমান্ত স্থিতিশীলতায় মনোযোগী। ভারত সীমান্ত নিরাপত্তা, উত্তর-পূর্ব ভারতের স্থিতিশীলতা এবং চীনের সঙ্গে কৌশলগত ভারসাম্য রক্ষার দৃষ্টিকোণ থেকে জান্তার সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখলেও বাস্তবতার কারণে কিছু বিদ্রোহী গোষ্ঠীর সঙ্গেও যোগাযোগ রাখছে। যুক্তরাষ্ট্র গণতান্ত্রিক শক্তির প্রতি সমর্থন অব্যাহত রাখলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তাদের সরাসরি সম্পৃক্ততা কমেছে; নিষেধাজ্ঞা ও মানবিক সহায়তা—বিশেষ করে রোহিঙ্গা সংকটে—এখন তাদের নীতির প্রধান দিক। এই পুরো প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ–মিয়ানমার সীমান্ত আজ একটি সক্রিয় নিরাপত্তা ফ্রন্টলাইন। রাখাইনে সংঘাত তীব্র হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সীমান্তে স্থলমাইন বিস্ফোরণ, গোলাবর্ষণের শব্দ, সশস্ত্র গোষ্ঠীর অনুপ্রবেশের আশঙ্কা—এসব আর বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। সীমান্তবর্তী গ্রামবাসী আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছে। একটি বিস্ফোরণ শুধু প্রাণহানি ঘটায় না; তা কৃষিকাজ, শিক্ষা ও স্থানীয় অর্থনীতিকে ব্যাহত করে। দীর্ঘস্থায়ী অনিশ্চয়তা সামাজিক ও মানসিক ক্ষত তৈরি করছে।

রোহিঙ্গা সংকট এই পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। বহু বছরের বাস্তুচ্যুতি, অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ এবং আন্তর্জাতিক সমাধানের অভাব শিবিরগুলোকে নিরাপত্তাজনিত ঝুঁকির মধ্যে রেখেছে। অপরাধী চক্র ও উগ্রপন্থী গোষ্ঠীর তৎপরতার আশঙ্কা বাড়ছে। মানবিক সহায়তা অপরিহার্য, কিন্তু আইনশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও সমান জরুরি। সীমান্ত অস্থিরতা ও শিবিরভিত্তিক ঝুঁকি একে অপরকে প্রভাবিত করছে। রোহিঙ্গা সমস্যা আজ বাংলাদেশের ওপর অর্থনৈতিক, সামাজিক, পরিবেশগত ও নিরাপত্তাগত বহুমাত্রিক চাপ সৃষ্টি করেছে। অথচ সংকটের উৎস মিয়ানমারে হলেও সবচেয়ে বড় বোঝা বহন করছে বাংলাদেশ। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সহানুভূতিশীল বিবৃতি যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন কার্যকর রাজনৈতিক উদ্যোগ, কূটনৈতিক চাপ এবং নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের বাস্তবসম্মত রোডম্যাপ। সীমান্ত নিরাপত্তা, স্থলমাইন অপসারণ এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা রক্ষায় সমন্বিত আন্তর্জাতিক সহযোগিতা জরুরি। বাংলাদেশের জন্য এখন কৌশলগত ভারসাম্য রক্ষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একদিকে মানবিক দায়িত্ব, অন্যদিকে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা—এই দুইয়ের সমন্বয় করেই অগ্রসর হতে হবে। দ্বিপাক্ষিক ও বহুপাক্ষিক ফোরামে সক্রিয় কূটনীতি জোরদার করতে হবে, যাতে সংকটটি দীর্ঘস্থায়ী কিন্তু উপেক্ষিত সমস্যায় পরিণত না হয়। সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, গোয়েন্দা সমন্বয় এবং প্রতিরক্ষা প্রস্তুতি আরও সুসংহত করা প্রয়োজন। ২০২৬ সালের শুরুতে দাঁড়িয়ে মিয়ানমারের জন্য স্পষ্ট রাজনৈতিক সমাধান দৃশ্যমান নয়। নির্বাচন জান্তার জন্য একটি কাঠামোগত বৈধতার আবরণ তৈরি করেছে, কিন্তু যুদ্ধক্ষেত্রের বাস্তবতা বদলায়নি। চীন সীমান্ত ঘিরে প্রভাব বিস্তার করছে, রাখাইনে আরাকান আর্মি শক্ত অবস্থানে, ভারত কৌশলগত ভারসাম্য খুঁজছে, যুক্তরাষ্ট্র মানবিক সহায়তায় মনোযোগী—আর এই জটিলতার মাঝখানে বাংলাদেশ সরাসরি প্রভাব বহন করছে। মিয়ানমারের আগুন এখন কেবল অভ্যন্তরীণ নয়; এটি আঞ্চলিক নিরাপত্তা সমীকরণকে নাড়িয়ে দিচ্ছে। এই বাস্তবতায় সময়োচিত ও সমন্বিত পদক্ষেপ ছাড়া চাপ আরও গভীর হবে—আর তার প্রতিক্রিয়া প্রথমে ও সবচেয়ে বেশি অনুভব করবে সীমান্তবর্তী দেশগুলো, বিশেষত বাংলাদেশ।

বাংলাদেশের পক্ষ থেকেও আরও সক্রিয়, সুসংগঠিত ও বহুমুখী কূটনৈতিক তৎপরতা প্রয়োজন। দ্বিপাক্ষিক আলোচনার পাশাপাশি আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক ফোরামে বিষয়টি ধারাবাহিকভাবে তুলে ধরতে হবে, যেন এই সংকট ‘দীর্ঘস্থায়ী কিন্তু উপেক্ষিত’ সমস্যায় পরিণত না হয়। শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান, মানবিক দায়িত্ব এবং রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা—এই তিনটির ভারসাম্য রক্ষা করেই বাংলাদেশকে সামনে এগোতে হবে। এই সীমান্তের প্রতিটি বিস্ফোরণ, প্রতিটি গুলির শব্দ আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়—রোহিঙ্গা সংকট ও মিয়ানমারের সংঘাত আর দূরের কোনো সমস্যা নয়। এটি আমাদের ঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে থাকা এক বাস্তব চ্যালেঞ্জ। এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে এই চাপ আরও গভীর হবে, আর তার মূল্য দিতে হবে আমাদের জনগণকেই। সব মিলিয়ে ২০২৬ সালের শুরুতে দাঁড়িয়ে মিয়ানমারের জন্য কোনো স্পষ্ট সমাধান দৃশ্যমান নয়। জান্তা ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে নির্বাচনের আশ্রয় নিচ্ছে, চীন সীমান্ত ঘিরে স্থিতিশীলতা নিয়ন্ত্রণে রাখছে, পশ্চিমাঞ্চলে আরাকান আর্মি নিজের কর্তৃত্ব বিস্তৃত করছে, ভারত কৌশলগত ভারসাম্য খুঁজছে, আর যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব মানবিক সহায়তায় সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ছে। এর মধ্যেই বাংলাদেশকে মোকাবিলা করতে হচ্ছে সীমান্ত নিরাপত্তা, শরণার্থী চাপ এবং আঞ্চলিক অস্থিরতার বাস্তব চ্যালেঞ্জ। মিয়ানমারের আগুন এখন আর কেবল অভ্যন্তরীণ নয়—এটি পুরো অঞ্চলকে স্পর্শ করছে, এবং তার ঢেউ সবচেয়ে আগে এসে লাগছে সীমান্তবর্তী দেশগুলোর ওপর।

লেখকঃ সাবেক সামরিক কুটনিতিক, নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক, গবেষক ও লেখক।

hrmrokan@hotmail.com


Leave a comment