ফ্যাসিবাদের খতিয়ানঃ জঙ্গি-ন্যারেটিভ ও রাষ্ট্রীয় অবিচার  

মেজর জেনারেল এইচ আর এম রোকন উদ্দিন(অব)

বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসে কিছু ঘটনা আছে, যা শুধু একজন ব্যক্তির জীবনের ট্র্যাজেডি নয়; বরং রাষ্ট্র, বিচারব্যবস্থা, নিরাপত্তা কাঠামো এবং জাতীয় সার্বভৌমত্বের চরিত্র নিয়ে গভীর প্রশ্ন তোলে। মেজর জিয়াউল হকের ঘটনা তেমনই এক অধ্যায়। এটি কেবল একজন সাবেক সামরিক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে মামলা, অভিযোগ বা দণ্ডের বিষয় নয়; বরং এটি সেই বৃহত্তর রাজনৈতিক-নিরাপত্তা বাস্তবতার অংশ, যেখানে “জঙ্গি” শব্দটি বহু সময় রাষ্ট্রীয় দমননীতি, রাজনৈতিক প্রতিহিংসা এবং চরিত্রহননের অস্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

মেজর জিয়াউল হক ছিলেন একজন মেধাবী, প্রশিক্ষিত ও স্বীকৃত সামরিক কর্মকর্তা। সিলেট ক্যাডেট কলেজ থেকে শিক্ষাজীবন শুরু করে তিনি বাংলাদেশ মিলিটারি একাডেমির ৪১তম লং কোর্সে অসাধারণ কৃতিত্বের পরিচয় দেন। তিনি Sword of Honor, Kudrat-e-Khuda Gold Medal, Osmani Gold Medal এবং Weapon Training Plaque অর্জন করেন—যা প্রমাণ করে তিনি শুধু একজন সাধারণ অফিসার ছিলেন না; বরং মেধা, সামরিক দক্ষতা, নেতৃত্বগুণ ও পেশাদারিত্বে ছিলেন উজ্জ্বল। পরবর্তীতে Officers Computer Course এবং Junior Command & Staff Course-এও তিনি প্রথম স্থান অর্জন করেন। এমন একজন অফিসারকে যদি রাষ্ট্রীয় বয়ানের মাধ্যমে একদিন “জঙ্গি কার্ডের পোস্টার বয়” বানানো হয়, তাহলে প্রশ্ন উঠবেই—এটি কি সত্যের বিচার, নাকি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে নির্মিত একটি ন্যারেটিভ?

বাংলাদেশে গত প্রায় দুই দশকে “জঙ্গি ন্যারেটিভ” একটি শক্তিশালী রাষ্ট্রীয় হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে বলে বহু মহল অভিযোগ করে আসছে। এই ন্যারেটিভের মাধ্যমে কখনো রাজনৈতিক বিরোধীদের দমন করা হয়েছে, কখনো আন্তর্জাতিক মহলের সহানুভূতি আদায় করে ক্ষমতার বৈধতা প্রতিষ্ঠার চেষ্টা হয়েছে, আবার কখনো বিচারবহির্ভূত হত্যা, গুম, রিমান্ড, পরিবার হয়রানি ও মিডিয়া ট্রায়ালকে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। এমনকি গণআন্দোলন, ছাত্র-জনতার প্রতিবাদ কিংবা রাষ্ট্রীয় অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো মানুষদেরও কখনো কখনো “জঙ্গি”, “রাষ্ট্রবিরোধী” বা “নাশকতাকারী” হিসেবে চিহ্নিত করার প্রবণতা দেখা গেছে। এই প্রেক্ষাপটেই মেজর জিয়াউল হকের ঘটনাকে বিচার করতে হবে। পিলখানা হত্যাকাণ্ডের পর বাংলাদেশের সেনাবাহিনীর ভেতরে গভীর ক্ষত সৃষ্টি হয়। বহু তরুণ অফিসার সেই ঘটনার প্রকৃতি, তদন্ত, দায়ীদের ভূমিকা এবং রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনার ব্যর্থতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন। মেজর জিয়াউল হকও সেই প্রজন্মের একজন অফিসার ছিলেন, যাদের মনোজগতে পিলখানার ঘটনা গভীর অভিঘাত সৃষ্টি করেছিল। রাষ্ট্রের নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠানের ভেতর যদি প্রশ্ন তোলা অপরাধ হয়ে দাঁড়ায়, যদি সত্য জানতে চাওয়া বিদ্রোহ হিসেবে বিবেচিত হয়, তাহলে সেটি কোনো সুস্থ রাষ্ট্রব্যবস্থার লক্ষণ নয়। অভিযোগ আছে, পিলখানা-পরবর্তী সময়ে কিছু দেশপ্রেমিক অফিসারকে পরিকল্পিতভাবে চিহ্নিত করা হয়, কেউ চাকরি হারান, কেউ গুমের শিকার হন, কেউ মিথ্যা মামলায় জড়ান, কেউ দেশ ছাড়তে বাধ্য হন। মেজর জিয়ার ঘটনাও সেই ধারাবাহিকতার অংশ বলে তার সমর্থকরা দাবি করেন।

মেজর জিয়াউল হকের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় অভিযোগ ছিল তাঁকে তথাকথিত একাধিক জঙ্গি সংগঠনের নেতা হিসেবে উপস্থাপন করা। কখনো তাঁকে হিযবুত তাহরীরের সঙ্গে যুক্ত বলা হয়েছে, কখনো নতুন জেএমবি বা আইএস ঘরানার সঙ্গে জড়ানো হয়েছে, কখনো আনসার আল-ইসলাম বা আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের নেতা হিসেবে প্রচার করা হয়েছে। কিন্তু বাস্তব প্রশ্ন হলো—একজন মানুষ একই সময়ে এত ভিন্ন ভিন্ন মতাদর্শ, কাঠামো ও সংগঠনের নেতা কীভাবে হতে পারেন? এই ধরনের পরস্পরবিরোধী বয়ান রাষ্ট্রীয় প্রচারের বিশ্বাসযোগ্যতাকেই দুর্বল করে। যদি অভিযোগ সত্য হয়, তাহলে তার প্রমাণ সুসংহত, ধারাবাহিক ও আদালতে পরীক্ষিত হওয়া দরকার; আর যদি অভিযোগ বারবার বদলায়, তাহলে সেটি সত্য অনুসন্ধানের চেয়ে চরিত্রহননের প্রচেষ্টা বলেই বেশি মনে হয়। বিভিন্ন সময়ে সাংবাদিক, মানবাধিকারকর্মী ও ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্যরা কিছু জঙ্গিবিরোধী অভিযানের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। অভিযোগ আছে, কিছু অভিযানে আগে থেকেই আটক ব্যক্তিদের পরে “অপারেশন”-এর নামে হত্যা করা হয়েছে; কিছু ক্ষেত্রে ক্রসফায়ারের মাধ্যমে সম্ভাব্য গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষ্য বা সত্য চাপা দেওয়া হয়েছে; কিছু মামলায় জোরপূর্বক ১৬৪ ধারার জবানবন্দী আদায় করা হয়েছে; আবার কিছু ক্ষেত্রে সাক্ষীদের শিখিয়ে দেওয়া হয়েছে কী বলতে হবে। যদি এসব অভিযোগের সামান্য অংশও সত্য হয়, তাহলে তা কেবল মেজর জিয়াউল হকের জন্য নয়—বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থার জন্যও গভীর উদ্বেগের বিষয়।

অভিজিৎ রায় হত্যা মামলা, জুলহাজ মান্নান হত্যা মামলা, দীপন হত্যা মামলা—এসব আলোচিত মামলায় ভুক্তভোগী পরিবারের বক্তব্যগুলোও উপেক্ষা করা যায় না। নিহতদের পরিবারের কেউ কেউ তদন্তের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন, কেউ বলেছেন তদন্ত সংস্থা তাদের সঙ্গে যথাযথভাবে যোগাযোগ করেনি, কেউ বলেছেন চার্জশিটের বিষয়ে তাদের মতামত নেওয়া হয়নি। বিচার যদি সত্য অনুসন্ধানের প্রক্রিয়া হয়, তাহলে ভিক্টিম পরিবার, প্রত্যক্ষদর্শী, আহত ব্যক্তি এবং স্বাধীন প্রমাণ—এসবের গুরুত্ব সর্বাগ্রে থাকা উচিত। কিন্তু যখন বিচার প্রক্রিয়ায় এসব মৌলিক উপাদান অনুপস্থিত বা দুর্বল থাকে, তখন ফাঁসির মতো চূড়ান্ত দণ্ডের নৈতিক ভিত্তি প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে। মেজর জিয়াউল হকের বিরুদ্ধে তিনটি মৃত্যুদণ্ডের রায় দেওয়ার বিষয়টি আরও গভীরভাবে পুনর্বিবেচনার দাবি রাখে। বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য যে, তার সমর্থকদের দাবি অনুযায়ী, তিনটি রায়ই একই বিচারকের আদালতে হয়েছে। পরবর্তীতে সেই বিচারকের ভূমিকা ও রাজনৈতিক অবস্থান নিয়েও বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। বিচারব্যবস্থা যদি রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত না থাকে, তাহলে মৃত্যুদণ্ডের মতো অপরিবর্তনীয় শাস্তি কখনোই নিরাপদ বিচার হতে পারে না। কারণ ভুল বিচারের সবচেয়ে ভয়াবহ রূপ হলো এমন দণ্ড, যা কার্যকর হয়ে গেলে সংশোধনের সুযোগ থাকে না।

২০১৬ সালে মেজর জিয়াউল হকের নামে ২০ লক্ষ টাকা পুরস্কার ঘোষণার ঘটনাও রাষ্ট্রীয় দায়িত্বশীলতার প্রশ্ন তোলে। গণমাধ্যমে তাঁকে গুলশান, শোলাকিয়া ও কল্যাণপুর ঘটনার “মাস্টারমাইন্ড” হিসেবে প্রচার করা হলেও পরবর্তীতে অভিযোগ ওঠে যে এসব ঘটনায় তাঁর বিরুদ্ধে কোনো আনুষ্ঠানিক মামলা, চার্জশিট বা আইনি কাগজপত্রে সুস্পষ্ট ভিত্তি ছিল না। যদি সত্যিই কোনো সরকারি নথি ছাড়া, কোনো বিচারিক প্রমাণ ছাড়া, কোনো তদন্ত সম্পন্ন হওয়ার আগেই একজন সাবেক সামরিক কর্মকর্তাকে জাতীয়ভাবে “মাস্টারমাইন্ড” বানিয়ে প্রচার করা হয়ে থাকে, তাহলে সেটি গুরুতর রাষ্ট্রীয় অন্যায়। এমন প্রচার একজন মানুষের জীবন, পরিবার, নিরাপত্তা, সম্মান ও ভবিষ্যৎ ধ্বংস করে দিতে পারে। এই অবস্থায় সরকারের উচিত মেজর জিয়াউল হকের বিষয়ে একটি মানবিক, আইনসম্মত ও নিরপেক্ষ অবস্থান গ্রহণ করা। বিষয়টি রাজনৈতিক প্রতিশোধের দৃষ্টিতে নয়, ন্যায়বিচার ও রাষ্ট্রীয় মর্যাদার প্রশ্ন হিসেবে দেখা প্রয়োজন। প্রথমত, তাঁর বিরুদ্ধে থাকা সব মামলার নথি, সাক্ষ্য, জবানবন্দী, প্রমাণ, তদন্ত প্রক্রিয়া এবং অভিযুক্তদের সঙ্গে আচরণ স্বাধীনভাবে পুনর্মূল্যায়ন করা দরকার। দ্বিতীয়ত, যেসব মামলায় গুম, জবরদস্তি, নির্যাতন বা চাপ দিয়ে জবানবন্দী আদায়ের অভিযোগ আছে, সেসব মামলার ভিত্তি পুনরায় পরীক্ষা করা জরুরি। তৃতীয়ত, তাঁর বিরুদ্ধে ঘোষিত পুরস্কার, মিডিয়া ট্রায়াল ও রাষ্ট্রীয় প্রচারের বৈধতা পর্যালোচনা করা উচিত। চতুর্থত, যদি দেখা যায় তিনি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলা ও প্রচারণার শিকার, তাহলে তাঁকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার সুযোগ দিতে হবে।

বাংলাদেশের রাষ্ট্রের মর্যাদা এখানেই—রাষ্ট্র যদি ভুল করে, তাহলে তা সংশোধনের সাহস দেখাবে। কোনো নাগরিককে অন্যায়ভাবে “জঙ্গি” বানিয়ে দিলে, তার জীবন ধ্বংস হয়ে গেলে, তার পরিবার সামাজিকভাবে বিপর্যস্ত হলে—রাষ্ট্রের দায়িত্ব শুধু নীরব থাকা নয়; বরং সত্য উদঘাটন করা, ক্ষতিপূরণ দেওয়া এবং সম্মান পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা। মেজর জিয়াউল হক যদি সত্যিই অন্যায়ের শিকার হয়ে থাকেন, তাহলে তাঁর ফিরে আসা শুধু একজন ব্যক্তির পুনর্বাসন নয়; এটি হবে রাষ্ট্রীয় ন্যায়বিচারের পুনর্জাগরণ। সরকারের উচিত একটি স্বাধীন কমিশন গঠন করা, যা ২০১৩ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত আলোচিত জঙ্গিবিরোধী অভিযান, সাজানো মামলা, গুম, ক্রসফায়ার, জোরপূর্বক জবানবন্দী এবং মিডিয়া ট্রায়ালের অভিযোগগুলো নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করবে। এই কমিশনে বিচারক, মানবাধিকারকর্মী, সাবেক সামরিক কর্মকর্তা, আইন বিশেষজ্ঞ, সিভিল সোসাইটি প্রতিনিধি এবং প্রয়োজন হলে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক রাখা যেতে পারে। এতে শুধু মেজর জিয়ার ঘটনাই নয়, বহু নিরপরাধ ব্যক্তি ও পরিবারের ওপর সংঘটিত সম্ভাব্য রাষ্ট্রীয় অন্যায়ও সামনে আসবে। মেজর জিয়াউল হকের ঘটনা তাই শুধু ব্যক্তিগত নয়; এটি একটি জাতীয় পরীক্ষা। আমরা কি সত্যকে ভয় পাব, নাকি সত্যকে স্বীকার করার সাহস দেখাব? আমরা কি পুরনো রাজনৈতিক ন্যারেটিভের বন্দী থাকব, নাকি ন্যায়বিচারের পথে হাঁটব? আমরা কি একজন সম্ভাব্য নির্যাতিত নাগরিককে স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে দেব, নাকি তাকে চিরদিনের জন্য রাষ্ট্রীয় অপপ্রচারের বোঝা বইতে বাধ্য করব?

ন্যায়বিচার কোনো দয়া নয়; এটি রাষ্ট্রের দায়িত্ব। মেজর জিয়াউল হকের বিরুদ্ধে সব অভিযোগ যদি প্রমাণভিত্তিক হয়, তাহলে তা আদালতে স্বচ্ছভাবে প্রতিষ্ঠিত হোক। আর যদি অভিযোগগুলো রাজনৈতিকভাবে নির্মিত, জোরপূর্বক স্বীকারোক্তি-নির্ভর, মিডিয়া ট্রায়াল-ভিত্তিক এবং গোয়েন্দা ন্যারেটিভের অংশ হয়ে থাকে, তাহলে সরকারের উচিত দ্রুত তাঁর প্রতি ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা। বাংলাদেশকে সামনে এগোতে হলে বিচারহীনতা, গুম, সাজানো মামলা, রাষ্ট্রীয় মিথ্যাচার এবং রাজনৈতিক প্রতিহিংসার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতেই হবে। মেজর জিয়াউল হককে ন্যায়বিচার দেওয়া মানে শুধু একজন সাবেক সেনা কর্মকর্তাকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে দেওয়া নয়; বরং এটি হবে বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থা, সেনাবাহিনীর মর্যাদা, নাগরিক অধিকার এবং রাষ্ট্রীয় আত্মমর্যাদার পুনঃপ্রতিষ্ঠার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।


Leave a comment